নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণ নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তবে স্যাটেলাইট ছবি ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো যে ব্যাখ্যাটি সামনে এসেছে, তা হলো—নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীর প্রবাহে নেমে আসে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পরে সেই বাধ ভেঙে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি দুর্যোগের আগাম সতর্কতা নিয়ে চীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোতেকোশি নদী ব্যবস্থায় আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। প্রবল স্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর ও বরফের বিশাল স্তূপ নেমে আসায় মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১৭৭ জনে পৌঁছেছে। নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা এখনো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রথম দিকে নেপালের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই এলাকায় অনুভূত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের বরফ ও পাথরের অংশ ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, যে ভূকম্পনটি রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি সম্ভবত কোনো স্বাভাবিক ভূমিকম্প ছিল না। বরং হিমবাহের বরফ ও পাথরের বড় অংশ ধসে পড়া এবং সেই ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই ওই ভূকম্পনসদৃশ শক্তি তৈরি হয়েছিল।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণেও এই ব্যাখ্যার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা প্ল্যানেট ল্যাবসের দুর্যোগের আগের ও পরের ছবিতে দেখা যায়, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের সামনের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় নেমে এসেছে। আগে সবুজে ঢাকা থাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ পরে বাদামি রঙের পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায়।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্তের মতে, হিমবাহের সামনের অংশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল এবং এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা যুক্ত হয়ে নিচে নেমে থাকতে পারে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট ছবিতে বড় ধরনের হিমবাহ ধসের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তাঁর ধারণা, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে তুষার গলার হার বেড়ে থাকতে পারে। তবে হিমবাহ কেন ভেঙে পড়ল, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীর এলাকায় হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখারেল স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে নেপালের অংশে বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ঘটনাটির ভয়াবহতার অন্যতম কারণ ছিল বন্যার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, পলি ও বরফের মিশে যাওয়া। সাধারণ নদীবন্যায় পানির স্রোত প্রধান ধ্বংসকারী শক্তি হলেও এ ধরনের ধ্বংসাবশেষ-স্রোতে পানির সঙ্গে বিশাল পাথর ও মাটি উচ্চগতিতে নিচে নেমে আসে। পাহাড়ি ঢালে উচ্চতা থেকে নেমে আসা এই স্রোত কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে। এবারের বন্যায়ও সেই চিত্র দেখা গেছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট বা আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, পানি, পলি ও বড় বড় পাথরের শক্তিশালী স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে গেছে। নদীর ভাটিতে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
তবে বন্যার উৎস নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। চীনের তিব্বত অংশে কোনো ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ বা অন্য কোনো অবকাঠামো ধসে এই বিপর্যয় ঘটেছে কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, চীনের ভূখণ্ডে দুর্যোগের কোনো পূর্বাভাস পাওয়া গেলে ভাটির দিকে নেপালের মানুষকে আগাম সতর্ক করা সম্ভব ছিল কি না।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নেপালে চীনা দূতাবাস বলেছে, ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল প্রান্তে ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পসদৃশ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশাল কাদার স্রোতে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী উভয় অংশে হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। চীনা দূতাবাসের বক্তব্য, আগাম সতর্কতা না দেওয়ার কারণে নেপালে প্রাণহানি হয়েছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। তারা বলেছে, দোষারোপের চেয়ে সহযোগিতাই জীবন বাঁচাতে বেশি কার্যকর।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলিও জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টির কাছে ভূমিধসে অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। দুর্যোগের কারণে চীনের দিকের সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জিরং বন্দর চীন ও নেপালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থল যোগাযোগের একটি কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে ক্ষয়ক্ষতি দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আগাম সতর্কতা নিয়ে নেপালে অবশ্য প্রশ্ন থেকেই গেছে। নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও ২০১৫ সালের ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান নির্বাহী গোবিন্দ রাজ পোখরেল বলেছেন, চীনের উন্নত স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ধরনের পূর্বাভাস বা চিত্র পাওয়া সম্ভব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর মতে, নেপালের দিকে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না থাকা সত্ত্বেও এমন আকস্মিক বন্যা মানুষের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় কার্যকর দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কতটা সক্রিয় ছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে এই মুহূর্তে চীনের কোনো অবহেলার কারণে বন্যার ভয়াবহতা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল, ঘটনাক্রম এবং সীমান্তের দুই পাশে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন। একইভাবে চীনের ভূখণ্ডে কোনো বাঁধ বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ধসে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে—এই দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বন্যার মূল কারণ হিসেবে হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা জোরালো হলেও এর পেছনে কী কারণে হিমবাহের অংশটি ভেঙে পড়ল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দ্রুত তুষার গলা, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা, ভূমিধস, নির্মাণকাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছুই বিবেচনায় রাখছেন। তবে এবারের নির্দিষ্ট ঘটনাটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।
হিমালয়ের সামগ্রিক পরিস্থিতি অবশ্য উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড় গত তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। গত এক দশকে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে হিমবাহ হ্রদ তৈরি, হিমবাহ ধস এবং হিমবাহ-সম্পৃক্ত আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এবারের ঘটনাটি সেই বৃহত্তর ঝুঁকিরই একটি ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রাসুয়া জেলার পাহাড়ি এলাকায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থাকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আইসিআইএমওডি জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার মতো দুর্যোগ ক্রমেই ঘন ঘন এবং তীব্র হচ্ছে।
গত বছরের আগস্টেও একই অঞ্চলে তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। সে ঘটনায় নয়জনের মৃত্যু এবং জিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরপর এমন ঘটনা সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং নেপাল-চীনের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এবারের বিপর্যয় তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যার ঘটনা নয়; এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশ, হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং সীমান্তবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার কারণ তৈরি করেছে। হিমবাহ ধসের প্রকৃত কারণ জানতে আরও স্যাটেলাইট তথ্য, ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও মাঠপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে নেপালের ভাটির জনগোষ্ঠীকে কত দ্রুত সতর্ক করা যায়, সে বিষয়ে চীন ও নেপালের মধ্যে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য সীমান্ত-পারাপার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি হয়ে উঠেছে।