ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ বন ও পিটভূমিতে ছড়িয়ে পড়া দাবানলের ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে পৌঁছে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আকাশে ঘন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, কোথাও কোথাও বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে ধোঁয়া দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ার বোর্নিও অঞ্চল হয়ে ফিলিপাইন পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। ফলে কয়েকটি দেশে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটভূমির আগুন এখন মূলত সুমাত্রা ও কালিমান্তান দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ ছয়টি প্রদেশে আগুন নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু জুলাই মাসেই প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মোট পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন সরকারি ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, আগুনের মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, চলতি বছর শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা এবং বৃষ্টির ঘাটতি বন ও পিটভূমিকে আরও দাহ্য করে তুলছে। দেশটির কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, সেপ্টেম্বর মাসে এল নিনোর প্রভাব তীব্র হওয়ায় দাবানল নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আগুনের উৎসগুলোর মধ্যে পিটভূমির আগুন বিশেষভাবে বিপজ্জনক। মাটির নিচে থাকা শুকনো পিটে আগুন জ্বলে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এবং ওপর থেকে তা সব সময় সহজে শনাক্ত করা যায় না। এ ধরনের আগুন থেকে বিপুল পরিমাণ সূক্ষ্ম কণা, কার্বন ও অন্যান্য দূষক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিপাইনের পরিবেশ কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, কালিমান্তানের পিটভূমিতে চলমান আগুন থেকে উৎপন্ন PM2.5-সহ সূক্ষ্ম কণা বাতাসের প্রবাহে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ইন্দোনেশিয়ার কাছের মালয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সারাওয়াকে। ২ সেপ্টেম্বর দুপুরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সারাওয়াকের কুচিংয়ে এয়ার পলিউট্যান্ট ইনডেক্স (API) ছিল ৩১১, যা ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ের। সেরিয়ানে ৩০৫, লুন্ডুতে ৩১৫, লুবক আন্তুতে ৩৩১ এবং কানওয়িটে ৩১৬ রেকর্ড করা হয়। আরও কয়েকটি এলাকায় সূচক ২০০-এর ওপরে ছিল, অর্থাৎ সেসব এলাকাও ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
মালয়েশিয়ার সাবাহ ও সারাওয়াকের বিভিন্ন এলাকাতেও ধোঁয়াশার কারণে বায়ুর মান দ্রুত অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সারাওয়াক কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বৃষ্টির বা ক্লাউড সিডিং কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিয়েছে। পরে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনের ক্লাউড সিডিং অভিযান শুরু করার খবরও পাওয়া গেছে। লক্ষ্য হচ্ছে বৃষ্টির মাধ্যমে বাতাসের দূষিত কণা ধুয়ে দেওয়া এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা।
ধোঁয়ার কারণে মালয়েশিয়ায় বাইরে অবস্থান, শারীরিক পরিশ্রম ও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও সতর্কতা জারি হয়েছে। বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়লে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্র বা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় থাকা মানুষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি এলাকায় বাইরে ক্রীড়া ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করার পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
তবে এবার ধোঁয়া শুধু মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলেই আটকে নেই। তা আরও দূরে ফিলিপাইন পর্যন্ত পৌঁছেছে। ১ সেপ্টেম্বরের দিকে মেট্রো ম্যানিলাসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ধোঁয়াশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফিলিপাইনের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো জানিয়েছে, কালিমান্তানের দাবানল থেকে আসা PM2.5 কণা দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ু বা ‘হাবাগাত’-এর মাধ্যমে ফিলিপাইনের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
ফিলিপাইনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মেট্রো ম্যানিলা ছাড়াও ক্যালাবারজোন, সেন্ট্রাল লুজন ও মিমারোপা অঞ্চলে ধোঁয়ার প্রভাব শনাক্ত হয়েছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং বায়ুদূষণে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় বাইরে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধোঁয়ার গতিপথ আবহাওয়া ও বাতাসের দিকের ওপর নির্ভর করায় একেক সময়ে একেক অঞ্চল বেশি আক্রান্ত হতে পারে।
মেট্রো ম্যানিলায় পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হলেও ৩ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইনের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, রাজধানী অঞ্চলের ওপর দিয়ে ধোঁয়ার স্তর ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ম্যানিলা অবজারভেটরির গবেষক মারিয়া ওবিমিন্দা কামবালিজার মতে, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা ধোঁয়ার একটি প্রবাহ দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে ফিলিপাইনের দিকে এগিয়েছে। মেট্রো ম্যানিলার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হতে পারে, তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্য কিছু এলাকায় ধোঁয়ার প্রভাব আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
অন্যদিকে, ফিলিপাইনের সেবু অঞ্চলেও বায়ুর মান উদ্বেগজনকভাবে খারাপ হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর সকালে মেট্রো সেবুতে PM2.5-ভিত্তিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ২৫২-এ পৌঁছায়, যা ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ ধোঁয়ার প্রভাব শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; দেশের বিভিন্ন অংশেও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক ধোঁয়াশা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী ASEAN Specialised Meteorological Centre (ASMC) জানিয়েছে, উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য কালিমান্তান, সারাওয়াক, সাবাহ, ব্রুনেই এবং ফিলিপাইনের কিছু এলাকায় মাঝারি থেকে ঘন আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়ার স্তর শনাক্ত হয়েছে। দক্ষিণ সুমাত্রার কিছু এলাকাতেও ধোঁয়ার ঘনত্ব বেশি। আগুনপ্রবণ এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে হটস্পট ও ধোঁয়ার পরিস্থিতি আরও কিছুদিন উচ্চমাত্রায় থাকতে পারে এবং আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশার ঝুঁকি বজায় থাকবে বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রটি।
ইন্দোনেশিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থল ও আকাশপথে অভিযান জোরদার করেছে। প্রায় ৪৮ হাজার কর্মকর্তা ও সদস্য এবং ১ হাজার ৪০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবককে আগুন মোকাবিলায় কাজে লাগানো হয়েছে। আগুন নেভাতে ৩৪টি উড়োজাহাজ ব্যবহার করে পানি ছিটানোর অভিযানও চলছে। তবে ঘন ধোঁয়া ও পানির সংকটের কারণে আকাশপথে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু দেশীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক সহায়তাও চেয়েছে ইন্দোনেশিয়া। জাপান কালিমান্তানের বন ও পিটভূমির আগুন মোকাবিলায় তিনটি CH-47 হেলিকপ্টার পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ সহায়তা মূলত আগুন নিয়ন্ত্রণে আকাশপথে পানি ছিটানোসহ অন্যান্য জরুরি কার্যক্রমে ব্যবহারের কথা রয়েছে।
আগুনের কারণ নিয়েও তদন্ত চলছে। ইন্দোনেশিয়ার সরকার ১৯টি কোম্পানির জমিতে আগুনের অস্তিত্ব শনাক্ত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে পরিদর্শন ও তদন্ত শুরু করেছে। এসব কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় মোট ১১ হাজার ৪৭ হেক্টর জমিতে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে মোট ৪২টি কোম্পানিকে উচ্চ অগ্নিঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হলেও তদন্তাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম ও খাত সরকার প্রকাশ করেনি। আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে, নাকি দুর্ঘটনাজনিত—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই দাবানলের পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি এর বড় প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যে। ধোঁয়ার সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়াতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি বেশি। ইন্দোনেশিয়ায় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে ছয়টি প্রদেশের প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীকে দূরশিক্ষণ বা অনলাইন ক্লাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দাবানলের প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর ওপরও। বোর্নিও দ্বীপের আগুনপ্রবণ এলাকায় ওরাংওটাংসহ বিভিন্ন প্রাণী ঝুঁকিতে রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম কালিমান্তানের একটি পাম তেলবাগানসংলগ্ন আগুনের এলাকা থেকে উদ্ধার করা একটি ওরাংওটাং ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার কারণে শ্বাসতন্ত্রের গুরুতর সমস্যায় ভুগছিল। প্রাণী উদ্ধারকারী দলগুলো ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ওরাংওটাংকে আগুনের এলাকা থেকে সরিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের পরিবেশগত সংকট নয়; বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘদিনের ‘ট্রান্সবাউন্ডারি হেইজ’ বা আন্তঃসীমান্ত বায়ুদূষণের সংকটকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার বন ও পিটভূমির আগুনের ধোঁয়া বাতাসের গতিপথ অনুসরণ করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পৌঁছানোয় আগুন নেভানো যেমন জরুরি, তেমনি সীমান্ত পেরিয়ে বায়ুদূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ASEAN দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াদূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক কাঠামো চালু রেখেছে।
এ মুহূর্তে পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা আবহাওয়া। সেপ্টেম্বরজুড়ে শুষ্কতা ও এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকলে নতুন করে আগুনের হটস্পট বাড়তে পারে। আর বাতাসের প্রবাহ যদি কালিমান্তান ও সুমাত্রা থেকে মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের দিকে থাকে, তাহলে সীমান্ত পেরিয়ে ধোঁয়ার বিস্তারও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বায়ুর মান, আগুনের নতুন হটস্পট এবং বাতাসের গতিপথ—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।