বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজন নিয়ে একের পর এক প্রস্তাব দিচ্ছে নয়াদিল্লি। চলতি বছরেই অন্তত তিন দফা কূটনৈতিক চিঠি বা নোট ভারবাল পাঠিয়েছে ভারত। সর্বশেষ চিঠিতে আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের জন্য সম্ভাব্য তিনটি তারিখও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত করা হয়নি। বরং বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা ধীরে এগোতে চাইছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে খুব বেশি তৎপর হতে চাইছে না ঢাকা। ফলে ভারতের আগ্রহের বিপরীতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো সীমিত। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক হলেও আন্তমন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রস্তুতি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা সম্ভাব্য বৈঠকের জন্য নিজেদের প্রস্তাব ও এজেন্ডা প্রস্তুত করছে।
নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দুই দেশের নৌপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগের একাধিক সিদ্ধান্ত। এই বৈঠক না হওয়ায় নৌপ্রটোকল বা পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটির স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহনের চুক্তির আওতাধীন আন্তঃসরকার কমিটির বৈঠকও হচ্ছে না। সাধারণত এসব বৈঠক একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ঢাকায় এই বৈঠক হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী এবার বৈঠক হওয়ার কথা দিল্লিতে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের নৌপরিবহন সহযোগিতার এসব প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠকে আর অগ্রগতি হয়নি।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া বলেন, ভারত বৈঠকের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। তবে সম্ভাব্য সময় এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ বৈঠকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে সেই প্রস্তুতি আরও অগ্রসর হওয়া দরকার। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে থাকা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
দুই দেশের নৌপথে বাণিজ্য অবশ্য পুরোপুরি বন্ধ নেই। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পিআইডব্লিউটিঅ্যান্ডটির আওতায় নির্ধারিত নৌপথে দুই দেশের পণ্য পরিবহন চলছে। এই প্রটোকল রুটের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৬৬০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ১ হাজার ৭৯২ কিলোমিটার। এসব নৌপথ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের বিকল্প পথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌপথে ৪২ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৩ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও নৌবাণিজ্যের একটি অংশ সচল রয়েছে। কিন্তু বড় সম্ভাবনার জায়গা—ট্রান্সশিপমেন্ট, ক্রুজ সার্ভিস ও নতুন নৌরুট—সেখানে কার্যক্রম অনেকটাই থেমে আছে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা দুই দেশের যোগাযোগ সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বিষয়ে আলাদা চুক্তি রয়েছে। ভারতীয় সরকারি নথিতেও চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং পিআইডব্লিউটিটি রুটে পণ্য পরিবহনকে আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য নেওয়ার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও হয়েছিল। দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ কতটা আর্থিক সুবিধা পাবে, কী ধরনের মাশুল নির্ধারিত হবে এবং দেশের বন্দর ও অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব কী হবে—এসব বিষয় নতুন করে পর্যালোচনা করতে চাইছে ঢাকা। সম্প্রতি ভারতের একটি বড় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হয়ে পণ্য পরিবহনে আগ্রহ দেখালেও এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সম্ভাব্য বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু বিষয় জোরালোভাবে তোলার প্রস্তুতি চলছে। বিআইডব্লিউটিএ চাইছে ধুলিয়ান-ময়া-সুলতানগঞ্জ-রাজশাহী ও আরিচা নৌপথে পর্যাপ্ত নাব্যতা নিশ্চিত করা, দুই দেশের নৌযানের ক্রুদের ল্যান্ডিং পাসের সমস্যা দূর করা এবং খারাপ আবহাওয়ায় বাংলাদেশি জাহাজের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্ধারণ। ভারতের অতিরিক্ত চার্জ থেকে বাংলাদেশি জাহাজকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। ময়া-সুলতানগঞ্জসহ নতুন নৌপথ চালুর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব রুটে পরীক্ষামূলক চলাচল সফল হয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারের সম্মতির পর নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষও ভোমরা ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের অবকাঠামোসহ কয়েকটি বিষয় আলোচনায় তুলতে পারে। সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ, নৌপথের বর্তমান অবস্থা, আঞ্চলিক কানেকটিভিটি এবং দুই দেশের যৌথ প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সমুদ্রগামী জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের ভারতের ভিসা সহজ করার পুরোনো প্রস্তাবটি আবারও সামনে আনতে চায় নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
নৌপরিবহন সহযোগিতার আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হচ্ছে পর্যটকবাহী জাহাজ বা ক্রুজ সার্ভিস। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আলাদা সমঝোতা স্মারক রয়েছে। ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান তালিকাতেও চট্টগ্রাম-মোংলা ব্যবহার, পিআইডব্লিউটিটি, উপকূলীয় নৌপরিবহন এবং যাত্রী ও ক্রুজ সার্ভিসসংক্রান্ত চুক্তি ও এমওইউ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পর্যটকবাহী ক্রুজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে নৌপথে বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটন ও যাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
এদিকে আগামী ৭ থেকে ৯ অক্টোবর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ‘সাগরমন্থন: দ্য গ্রেট ওশেনস ডায়ালগ’-এ অংশ নিতে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে নৌমন্ত্রীর সম্ভাব্য সৌজন্য বৈঠকেও দুই দেশের নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
ফলে এখন নজর থাকবে ঢাকার পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। দিল্লি দ্রুত বৈঠক চাইলেও বাংলাদেশ চাইছে বিদ্যমান চুক্তি ও এমওইউগুলো শুধু আগের কাঠামোয় চালু না করে সেগুলো থেকে দেশের স্বার্থ কতটা নিশ্চিত করা যায়, তা আগে পর্যালোচনা করতে। বিশেষ করে ট্রান্সশিপমেন্ট, নৌপথের নাব্যতা, বাংলাদেশি জাহাজের ওপর অতিরিক্ত চার্জ এবং নাবিকদের ভিসা—এসব ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান কতটা কঠোর হয়, সেটিই হতে পারে পরবর্তী বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এ কারণে প্রস্তাবিত নৌসচিব পর্যায়ের বৈঠকটি নিছক নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।