জ্বালানি ও খাদ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে পাকিস্তানে আবারও মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে উঠেছে। আগস্টে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। এর ফলে মাত্র এক মাস এক অঙ্কে থাকার পর আবারও দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতিতে ফিরল পাকিস্তান।
পাকিস্তান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (পিবিএস) তথ্য বলছে, শুধু সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিই নয়, শহর ও গ্রাম—দুই এলাকাতেই মূল্যবৃদ্ধির চাপ বেড়েছে। আগস্টে শহরাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে তা ১২ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, জুলাইয়ে যা ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামীণ মানুষ মূল্যবৃদ্ধির আরও বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির এই নতুন চাপের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে খাদ্য ও জ্বালানি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্কের বোঝা সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে। *দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন* বলছে, সরকার আন্তর্জাতিক জ্বালানি ব্যয়ের বড় অংশ ভোক্তাদের ওপর স্থানান্তর করার নীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে মোটর জ্বালানির দাম এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
পেট্রল ও হাই-স্পিড ডিজেলের ওপর করের বোঝাও উল্লেখযোগ্য। *দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন*-এর হিসাবে, পেট্রলের প্রতি লিটারে পেট্রোলিয়াম লেভি, কার্বন লেভি ও কাস্টমস ডিউটি মিলিয়ে প্রায় ১১৬ পাকিস্তানি রুপি কর নেওয়া হচ্ছে। হাই-স্পিড ডিজেলের ক্ষেত্রে এ বোঝা প্রায় ১০১ রুপি। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির খরচেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পণ্য পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও দৈনন্দিন যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই তা ছড়িয়ে পড়ছে।
পিবিএসের হিসাবে, আগস্টে পরিবহন খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক ২ শতাংশ। জুলাইয়েও এই খাতে মূল্যবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ জ্বালানির বাড়তি ব্যয় দ্রুতই পরিবহন ভাড়ায় প্রতিফলিত হচ্ছে। পিবিএসের আলাদা হিসাবেও দেখা যায়, আগস্টে মোটর জ্বালানির দাম মাসিক হিসাবে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং বার্ষিক হিসাবে ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। পরিবহন সেবার দামও এক বছরে ২৮ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পাকিস্তানের জ্বালানি মূল্যও এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। *দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন*-এর উদ্ধৃত টোলা অ্যাসোসিয়েটসের গবেষণা অনুযায়ী, ডলারের হিসাবে হাই-স্পিড ডিজেলের দাম দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি। পেট্রলের দাম বাংলাদেশের পর পাকিস্তানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ফলে জ্বালানির ব্যয় পাকিস্তানের সামগ্রিক মূল্য কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বড় উদ্বেগ খাদ্যপণ্যের দাম। আগস্টে শহরাঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। পিবিএসের হিসাবে, জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে শহরাঞ্চলের খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে, আর গ্রামাঞ্চলে খাদ্যের দাম আরও দ্রুত বেড়েছে।
বাজারের কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে এক বছরে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। পিবিএসের হিসাবে, আগস্টে টমেটোর দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। গমের দাম বেড়েছে ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং গমের আটার দাম ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। গমজাত পণ্যের দামও ২২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। মাংসের দাম বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং দুধজাত পণ্যের দাম প্রায় ৯ শতাংশ।
গ্রামাঞ্চলে খাদ্যপণ্যের চাপ আরও তীব্র। পিবিএসের হিসাবে, আগস্টে গ্রামীণ এলাকায় এক বছরে টমেটোর দাম বেড়েছে ১৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ, পেঁয়াজ ১১৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ, গম ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং গমের আটা ৭৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামীণ বাজারে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরও বেশি হয়েছে।
সব পণ্যের দাম অবশ্য বাড়েনি। আগস্টে আলুর দাম জাতীয় শহরাঞ্চলীয় সূচকে এক বছর আগের তুলনায় ২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে। চিনির দাম কমেছে ১৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং মুরগির দাম কমেছে ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ। কিন্তু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি এসব স্বস্তিকে ছাপিয়ে গেছে।
বিশেষ করে গমের বাজার পরিস্থিতি পাকিস্তান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছর দেশটিতে ২ কোটি ৯৭ লাখ টন গম উৎপাদনের সরকারি দাবি রয়েছে। কিন্তু গম সংগ্রহে পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বাজারে সরবরাহ ও মজুত নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সরকার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগেই সরকার গমের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রাদেশিক চাহিদা মেটাতে প্রায় ২২ লাখ টন গমের প্রয়োজনের কথা সামনে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টন আমদানির পরিকল্পনা করা হয়। পাঞ্জাব ও সিন্ধুর সংগ্রহ ঘাটতি এবং ফেডারেল মজুতের ওপর চাপ এ সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
গমের বাজারে সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি মজুতদারির বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি। কারণ সরবরাহের ঘাটতি, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে খাদ্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি করছে। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার স্থিতিশীল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বাড়ছে। আগস্টে শহরাঞ্চলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যের বাইরে পোশাক, পরিবহন, জ্বালানি, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও অন্যান্য পরিষেবার ব্যয়ও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
পিবিএসের হিসাবে, আগস্টে পাইকারি মূল্যসূচক বা ডব্লিউপিআই মূল্যস্ফীতিও এক বছরে ১১ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে, যেখানে জুলাইয়ে তা ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে সংবেদনশীল মূল্যসূচক বা এসপিআইয়ের বার্ষিক বৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির এই গতি ভবিষ্যতে খুচরা বাজারেও আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত চাপও পুরোপুরি কমেনি। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে হিসাব করা কোর মূল্যস্ফীতি আগস্টে শহরাঞ্চলে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৬ ও ৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু খাদ্য ও জ্বালানির সাময়িক মূল্যবৃদ্ধিই নয়, অর্থনীতির অন্যান্য অংশেও দামের চাপ রয়ে গেছে।
আগস্টের মূল্যস্ফীতি পাকিস্তান সরকারের পূর্বাভাসের চেয়েও কিছুটা বেশি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এর আগে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে তা ১১ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। *দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন* জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
এ পরিস্থিতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলে ঋণের খরচ বাড়ে এবং বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ পড়ে। আবার জ্বালানি, খাদ্য ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে তৈরি মূল্যস্ফীতি শুধু সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
পাকিস্তান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব ও ব্যয়সংক্রান্ত নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের রাজস্ব ঘাটতি কমানো ও নির্ধারিত আর্থিক লক্ষ্য পূরণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়েছে বলে *দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন* উল্লেখ করেছে। কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারগুলো। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য, জ্বালানি ও যাতায়াতে ব্যয় হয়। টমেটো, পেঁয়াজ, গম, আটা ও জ্বালানির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়লে এসব পরিবারের হাতে অন্যান্য ব্যয়ের জন্য অর্থ কমে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতির সরকারি গড় হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ হলেও বাস্তবে পরিবারের ভোগের ধরন অনুযায়ী মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
সামনে পাকিস্তান সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক করা, গমের বাজার স্থিতিশীল করা এবং জ্বালানি ও করের চাপ সামলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। একদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, অন্যদিকে খাদ্য সরবরাহের দুর্বলতা—দুই চাপ একসঙ্গে থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কিছুদিন উঁচু থাকার ঝুঁকি রয়েছে। আগস্টের পরিসংখ্যান তাই পাকিস্তানের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি আবারও বড় উদ্বেগ হয়ে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।