হজযাত্রার প্রস্তুতিতে এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সৌদি আরব। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসল্লির আবাসন, যাতায়াত, খাবার ও পবিত্র স্থানগুলোর সেবা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে ২০২৭ সালের হজ মৌসুমে ‘অল-ইনক্লুসিভ’ বা সর্বসমন্বিত প্যাকেজ চালু করেছে দেশটির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি হজ এজেন্সি ও হাজিদের বিষয় দেখভালকারী দপ্তরগুলোকে আলাদা আলাদা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথক চুক্তি করতে হবে না; একটি ইলেকট্রনিক আবেদনের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবাগুলো চুক্তিবদ্ধ করা যাবে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই প্যাকেজে হাজিদের সৌদি আরবে পৌঁছানো থেকে শুরু করে দেশ ত্যাগ করা পর্যন্ত হজযাত্রার মৌলিক সেবাগুলো সমন্বিত থাকবে। চারটি প্রধান সেবা হলো—পবিত্র স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় সেবা, মক্কা ও মদিনায় আবাসন, পরিবহন এবং খাবার। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের হাজিদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী অতিরিক্ত বা ঐচ্ছিক সেবা যুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এতদিন হজ ব্যবস্থাপনায় আবাসন, পরিবহন, খাবার ও পবিত্র স্থানকেন্দ্রিক সেবার জন্য একাধিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদা চুক্তির প্রয়োজন হতো। নতুন ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়াকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি সরকার। এতে চুক্তির শর্ত, কোন সেবার দায়িত্ব কার এবং কীভাবে সেবা দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে বলে মনে করছে দেশটির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় বলছে, ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে এক আবেদনের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন করার ফলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে বিদেশি হজ এজেন্সি, হাজিদের বিষয় দেখভালকারী দপ্তর এবং সৌদি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সহজ হবে।
নতুন এই ব্যবস্থা ১৪৪৮ হিজরি, অর্থাৎ ২০২৭ সালের হজ মৌসুম সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে। সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ‘সার্ভিস অব দ্য গেস্টস অব গড’ কর্মসূচির লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে। বিপুলসংখ্যক বিদেশি হাজির আগমন ও অবস্থান ব্যবস্থাপনায় সেবাগুলোকে আরও সমন্বিত এবং দক্ষ করার লক্ষ্যেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
হজ ব্যবস্থাপনায় বিদেশি হাজিদের গুরুত্ব কতটা, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি ফর স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হজে মোট ১৭ লাখ ৭ হাজার ৩০১ জন হজ পালন করেন। এর মধ্যে বিদেশি হাজির সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৫ জন। সৌদি আরবের ভেতর থেকে হজ পালন করেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৬ জন। অর্থাৎ ওই বছর মোট হাজির প্রায় ৯১ শতাংশই এসেছিলেন বিদেশ থেকে।
বিদেশি হাজির এই বিশাল অংশের সেবা ব্যবস্থাপনাকে সামনে রেখেই নতুন প্যাকেজের গুরুত্ব দেখছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের হজ এজেন্সির জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদা চুক্তির পরিবর্তে একটি সমন্বিত চুক্তি করার সুযোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করতে পারে।
তবে ‘অল-ইনক্লুসিভ’ নাম হলেও সব ধরনের সেবা যে বাধ্যতামূলকভাবে একই প্যাকেজে থাকবে, তা নয়। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় চারটি মৌলিক সেবাকে প্যাকেজের মূল অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে। এর বাইরে হাজিদের প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সেবা যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। ফলে বিভিন্ন দেশের হাজিদের চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেজের কাঠামো কিছুটা ভিন্ন হতে পারবে।
সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। হাজিদের আগমন, আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করার লক্ষ্যেও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ‘অল-ইনক্লুসিভ’ প্যাকেজ সেই ধারারই আরেকটি সম্প্রসারণ।
২০২৭ সালের হজের প্রস্তুতি যত এগোবে, ততই প্যাকেজের আওতায় সেবার বিস্তারিত শর্ত, চুক্তির প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে আরও নির্দেশনা প্রকাশ করবে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে এরই মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—হজ ব্যবস্থাপনায় বিচ্ছিন্ন সেবার পরিবর্তে এক চুক্তিতে সমন্বিত সেবা দেওয়ার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে সৌদি আরব।