১৯ জুলাই নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার পর সেটিই হয়ে উঠেছিল লিওনেল মেসির সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। কয়েক সপ্তাহ পর, ৩১ আগস্ট, মেসি ঘোষণা দেন—আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না। ফলে বিশ্বকাপ ফাইনালটিকেই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেই গল্পের শেষ দৃশ্যটি পরে বদলে যায়। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পরও মেসিকে আবার জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরানোর উদ্যোগ নেয় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিযোগিতামূলক কোনো ম্যাচ নয়, দেশের মাটিতে সমর্থকদের সামনে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো। আর তাঁকে সেই ম্যাচ খেলতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। স্কালোনির যুক্তি ছিল সরল—‘এখন না হলে কখনোই নয়।’
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ট্রেনিং কমপ্লেক্সে বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্কালোনি জানান, মেসি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তা তাঁরা সবাই বুঝতে পারছিলেন। তারপরও যারা তাঁকে এত বছর ধরে ভালোবেসেছেন, তাঁদের সামনে এসে বিদায় নেওয়ার সুযোগটি যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই মেসিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ‘যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছিল, তা আমরা সবাই জানতাম। তারপরও সে মানুষদের—যারা তাকে ভীষণ ভালোবাসে—তাদের কাছে এসে বিদায় জানানোর আগ্রহ দেখিয়েছে। যদি শ্রদ্ধা জানানোর কোনো আয়োজনের কথা ভাবা হয়, তাহলে তা এখনই করা উচিত,’ বলেন স্কালোনি।
কেন এখনই? স্কালোনির ব্যাখ্যাও ছিল সেটিই। মেসি যদি আরও কিছুদিন খেলতে থাকেন, ভবিষ্যতে আবার বিদায়ের আয়োজন করা সম্ভব হবে কি না, কিংবা তখনকার আবেগ আজকের মতো থাকবে কি না—কোনোটিই নিশ্চিত নয়। ‘তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম আমি। তাকে বোঝানোর জন্য আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলাম যে, হলে এখনই নয়তো কখনোই নয়। কারণ পরে কী হবে, তা কেউ জানে না। সে বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল, যা খুবই ভালো ব্যাপার,’ বলেন আর্জেন্টিনা কোচ। মেসি শেষ পর্যন্ত রাজি হন।
১৫ সেপ্টেম্বর ঘোষিত আর্জেন্টিনার পরবর্তী তিন প্রীতি ম্যাচের দলে তাই ফিরে আসে তাঁর নাম। এএফএ জানায়, ৩০ সেপ্টেম্বর বলিভিয়া এবং ৩ অক্টোবর বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচে মেসি খেলবেন না। তাঁর জন্য রাখা হয়েছে ৬ অক্টোবরের ম্যাচটি—বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে। সেটিই হবে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ। অর্থাৎ, ১৯ জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল মেসির অবসর ঘোষণার আগ পর্যন্ত তাঁর সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু ৬ অক্টোবরের বেনিন ম্যাচটি হবে তাঁর আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ। এই দুইয়ের পার্থক্যটাই এত দিন তৈরি করেছিল বিভ্রান্তি।
মেসির অবসর ঘোষণার পেছনেও ছিল দীর্ঘ ভাবনা। বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি বিদায়ী বার্তাটি লিখেছিলেন। পরে ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়। শেষ পর্যন্ত ৩১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়াও জানিয়েছেন, স্কালোনির সঙ্গে আলোচনার পর মেসিকে ৬ অক্টোবরের ম্যাচে বিদায়ী উপস্থিতির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। মেসিকে তাঁর প্রাপ্য বিদায় দেওয়াই ছিল এই আয়োজনের উদ্দেশ্য। স্কালোনির ভাষায়, ‘এএফএ এবং সভাপতিও তাদের ভূমিকা পালন করেছেন। দারুণ ব্যাপার, এটা তার প্রাপ্য। এখন যা কিছু করা সম্ভব, তা এখনই করে ফেলা ভালো।’ তাই ৬ অক্টোবরের রাতটি মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নতুন কোনো অধ্যায়ের শুরু নয়। বরং দুই দশকের বেশি সময়ের এক অসাধারণ যাত্রার আনুষ্ঠানিক পর্দা নামার মুহূর্ত। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ করেছিল তাঁর সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু বিদায়টা হলো আরও একটু পরে—নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের সামনে। আর সেই শেষবারের মতো মাঠে নামার পেছনে স্কালোনির অবদান? তাঁর নিজের ভাষায়— এখন না হলে কখনোই নয়।