জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তাঁর প্রতিনিধিদল কীভাবে দেশে ফিরবেন—এমন প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জাতিসংঘে থাকা ইরানি প্রতিনিধিরা কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা তিনি নিশ্চিত নন।
বেসেন্টের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কার্যকর হতে শুরু করেছে। পেজেশকিয়ান ও তাঁর প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে পৌঁছান। পাঁচ দিনের সফর শেষে শনিবার তাঁদের তেহরানে ফেরার কথা রয়েছে।
ফক্স নিউজকে বেসেন্ট বলেন, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের ওপর চাপ এমন পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে, যা দেশটি আগে দেখেনি। তাঁর দাবি, নতুন মার্কিন পদক্ষেপের ফলে ইরানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে ইরান যে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি এখনো তা নয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও ইরান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ৮ সেপ্টেম্বর ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের বিমান খাতকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ট্রেজারির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই পদক্ষেপে মোট ৩৬টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর মধ্যে ইরানের বিমান চলাচল খাতকে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠান, সামনের সারির কোম্পানি এবং বিদেশি মধ্যস্থতাকারীরাও রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বিমান খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে জ্বালানি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, টিকিটিংসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও মার্কিন পদক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের ওপর চাপ বেড়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও ইরানের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলেছে। ব্লুমবার্গের ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ইরান থেকে ব্যাংকক, ফুকেট, সাংহাই ও কাবুলসহ বিভিন্ন গন্তব্যে অন্তত ছয়টি ফ্লাইট ছেড়ে যায়। বেসেন্টের বক্তব্যকে এমন অর্থে নেওয়ার সুযোগ নেই যে পেজেশকিয়ান ও তাঁর প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আটকা পড়েছেন। বরং প্রশ্নটি এখন তাঁদের ফেরার জন্য ব্যবহৃত বিমানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এবং সেই বিমানকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার সুযোগ নিয়ে।
পেজেশকিয়ান সাধারণ কোনো নির্ধারিত ইরানি যাত্রীবাহী ফ্লাইটে নিউইয়র্কে যাননি। তিনি একটি এয়ারবাস এ৩৪০ বিমানে নিউইয়র্কে পৌঁছান। বিমানটি পরিচালনা করে ইরানের তুলনামূলক অপরিচিত এয়ারলাইন আশিয়ানে।
গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশিয়ানে নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করে না এবং সাধারণ যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাও নেই। পেজেশকিয়ানকে বহনকারী বিমানটি তেহরান ছাড়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কে যাওয়ার পথে বিমানটি জ্বালানি নেওয়ার জন্য আলজেরিয়ায় থেমেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে একই ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে ফেরার পথও খোলা থাকতে পারে। তবে পেজেশকিয়ান একই বিমানে নিউইয়র্ক থেকে তেহরানে ফিরবেন কি না, তা এখনো প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব অবশ্য ইরানের বিমান চলাচলে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েকটি রুটে ফ্লাইট বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ রাখা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য শুধু উড্ডয়ন করাই নয়, বিদেশের বিমানবন্দরে অবতরণ, জ্বালানি সংগ্রহ, গ্রাউন্ড সার্ভিস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কায় কোনো তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠান ইরানি বিমানের সঙ্গে কাজ করতে না চাইলে আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনা আরও কঠিন হতে পারে।
তবে বুধবারের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পরও ইরানের কয়েকটি বিমান আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করেছে। এ তথ্য বেসেন্টের ‘৮০ থেকে ৯০ শতাংশ’ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবিকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না, তবে একই সঙ্গে এটিও দেখায় যে দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি।
পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর শেষ হওয়ার কথা শনিবার। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাঁর প্রতিনিধিদল কোন বিমানে এবং কোন রুটে তেহরানে ফিরবে। বেসেন্টের মন্তব্যে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা মূলত ইরানের বিমান খাতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটিকে ঘিরে। পেজেশকিয়ানের ব্যবহৃত বিমানটি যদি নিষেধাজ্ঞামুক্ত থাকে এবং প্রয়োজনীয় বিমানবন্দর সেবা পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর দেশে ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি এখনো নেই।
অন্যদিকে, বিমানটির ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে কিংবা তৃতীয় কোনো দেশের বিমানবন্দর জ্বালানি বা গ্রাউন্ড সার্ভিস দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
এদিকে পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেওয়া। বুধবার সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইরানের অবস্থান তুলে ধরেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির মধ্যেও আলোচনার বিষয়ে ইরানের প্রস্তুতির কথা জানান। একই দিনে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার আলোচনা হওয়ার কথাও সামনে এসেছে।
ফলে পেজেশকিয়ানের নিউইয়র্ক সফর এখন শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য ও বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর দেশে ফেরার জন্য কোন বিমান ব্যবহার করা হবে, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার বাস্তব প্রভাবের একটি দৃশ্যমান পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।