ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন প্রতিযোগিতা ডমেস্টিক থ্রি (ডি থ্রি) ট্রফির নিলামে তারকাদের ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি পয়েন্টে দল পেয়েছেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। তাঁকে দলে নিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ায় ২ কোটি ৩০ লাখ পয়েন্টে। অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদকে নিয়ে ছিল আরেক দফা কাড়াকাড়ি। তাঁকে ২ কোটি ১০ লাখ পয়েন্টে দলে নিয়েছে ওয়ালটন। আর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়েছেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। তাঁকে ২ কোটি পয়েন্টে নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অভিনব এই নিলাম। এখানে ক্রিকেটারদের মূল্য নির্ধারণ হচ্ছে টাকা দিয়ে নয়, ‘অকশন পয়েন্টে’। ফলে কোনো ক্রিকেটারকে দলে নিতে একটি দল কতটা আগ্রহী, অন্য দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার মূল্য কতটা বাড়ছে এবং নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে দল সাজাতে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো কী কৌশল নিচ্ছে—এসবই নিলামের আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
নিলাম শুরুর আগে সংবাদকর্মীদের কক্ষে এসে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছিলেন, ‘আমি আজকে পুরোপুরি দর্শক।’ পরে দর্শকের মতোই ক্রিকেটারদের মূল্য ও দলগুলোর কৌশল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন তিনি। তবে নিলামে কয়েকজন ক্রিকেটারের পয়েন্ট যে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি উঠেছে, তা ছিল তাঁর জন্যও বিস্ময়ের।
শরিফুলকে ঘিরে সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতা
নিলামের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা শরিফুল ইসলাম শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন আসরের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিকেটার। ২ কোটি ৩০ লাখ পয়েন্টে তাঁকে পেয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক। বাঁহাতি এই পেসারের নতুন বলে সুইং, গতির বৈচিত্র্য এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে কার্যকারিতা তাঁকে দলগুলোর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
শরিফুলের আগে নিলামে বড় আলোচনার জন্ম দেন তাসকিন আহমেদ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই পেসারকে পেতে দলগুলোর মধ্যে দর বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলে। শেষ পর্যন্ত ২ কোটি ১০ লাখ পয়েন্টে তাঁকে দলে নেয় ওয়ালটন। জাতীয় দলের পেস আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তাসকিনের অভিজ্ঞতা তিন সংস্করণেই দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়েছেন তানজিদ হাসান তামিম। ২ কোটি পয়েন্টে তাঁকে নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত এই বাঁহাতি ওপেনার তিন সংস্করণেই বাংলাদেশের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা রাখেন। টপ অর্ডারে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য তাঁকে নিলামে মূল্যবান করে তুলেছে।
নিলামের শুরু থেকেই আগ্রাসী ছিল ফরচুন গ্রুপ। সৌম্য সরকারকে ৭৫ লাখ পয়েন্টে নেওয়ার পর বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে দলে নেয় তারা। শান্তর জন্য ব্যয় হয় ১ কোটি ৫৫ লাখ পয়েন্ট। এরপর তানজিদকে ২ কোটি পয়েন্টে নিয়ে ব্যাটিং বিভাগে আরও শক্তি যোগায় দলটি।
তারকাদের দলে নিতে বড় অঙ্কের পয়েন্ট ব্যয়
জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে নিলামে একাধিক দলের আগ্রহ দেখা গেছে। সাইফ হাসানকে ১ কোটি ৯৫ লাখ পয়েন্টে নিয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট। একই পয়েন্টে পেসার হাসান মাহমুদকে দলে নিয়েছে এইস ব্লু স্টার। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান জাকের আলি অনিককে ১ কোটি ৮০ লাখ পয়েন্টে পেয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক।
বাংলাদেশের সাদা বলের অধিনায়ক লিটন কুমার দাস খেলবেন ওয়ালটনে। তাঁকে দেড় কোটি পয়েন্টে দলে নিয়েছে দলটি। পেসার সৈয়দ খালেদ আহমেদকেও একই পয়েন্টে পেয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট।
নিলামের প্রথম দিকেই দল পান অলরাউন্ডার শেখ মেহেদী হাসান। তিন সংস্করণেই কার্যকর এই ক্রিকেটারকে দেড় কোটি পয়েন্টে নিয়েছে ব্লু স্টার। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পাওয়া ক্রিকেটার ছিলেন সাব্বির রহমান। তাঁকে ১ কোটি ২ লাখ পয়েন্টে দলে নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ।
অন্যদিকে মুস্তাফিজুর রহমানকে ৭০ লাখ পয়েন্টে পেয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বাঁহাতি পেসারের জন্য পয়েন্ট তুলনামূলক কম থাকার কারণও নিলামের সময় স্পষ্ট হয়। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানান, প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে খেলবেন মুস্তাফিজ। মেলবোর্ন রেনেগেডস তাঁকে দলে নিয়েছে। ফলে ডি থ্রি ট্রফির টি-টোয়েন্টি পর্বে তাঁকে পাওয়া যাবে না; খেলতে পারবেন ওয়ানডে সংস্করণে।
বিগ ব্যাশে বাংলাদেশের আরেক প্রতিনিধি রিশাদ হোসেনও ডি থ্রি ট্রফির টি-টোয়েন্টি পর্বে খেলতে পারবেন না। তাঁকে ৬০ লাখ পয়েন্টে নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ। চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকা পেসার নাহিদ রানাকে ৭৫ লাখ পয়েন্টে পেয়েছে ব্লু স্টার। বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামকে ৮০ লাখ পয়েন্টে নিয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট।
টাকা নয়, পয়েন্টে কেন নিলাম
ডি থ্রি ট্রফির নিলামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ক্রিকেটারদের দল পাওয়ার মূল্য সরাসরি পারিশ্রমিক নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের বিদ্যমান আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী ম্যাচ ফি নির্ধারিত থাকবে। প্রথম শ্রেণির ম্যাচে একজন ক্রিকেটার পাবেন দেড় লাখ টাকা, এক দিনের ম্যাচে এক লাখ এবং টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা। ম্যাচ ফি সবার জন্য সমান।
ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স, চাহিদা ও দলগুলোর কৌশলকে নিলামে দৃশ্যমান করতে পয়েন্টভিত্তিক পদ্ধতি চালু করেছে বিসিবি। অর্থাৎ কোনো ক্রিকেটারের জন্য একটি দল যত বেশি পয়েন্ট ব্যয় করছে, সেটি তার বাজারমূল্যের সরাসরি আর্থিক পারিশ্রমিক নয়; বরং নির্ধারিত সীমার মধ্যে তাকে দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির আগ্রহের প্রতিফলন।
নিলামে ক্রিকেটারদের পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরির ভিত্তিমূল্য ৪০ লাখ পয়েন্ট, ‘বি’ ক্যাটাগরির ৩০ লাখ, ‘সি’ ক্যাটাগরির ২০ লাখ, ‘ডি’ ক্যাটাগরির ১০ লাখ এবং ‘ই’ ক্যাটাগরির পাঁচ লাখ পয়েন্ট। প্রতিটি দলের জন্য বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১০ কোটি পয়েন্ট। ফলে তারকা ক্রিকেটারদের দলে নিতে বেশি পয়েন্ট ব্যয় করলে পরবর্তী সময়ে স্কোয়াডের অন্য জায়গাগুলো পূরণে হিসাব করে এগোতে হবে দলগুলোকে।
নিলাম পরিচালনা করছেন ভারতের অভিজ্ঞ ধারাভাষ্যকার, উপস্থাপক ও কুইজ মাস্টার চারু শর্মা। ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির আইকন ক্রিকেটার আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। নিলামের তালিকায় আছেন আড়াই শতাধিক ক্রিকেটার; তাঁদের মধ্য থেকে দলগুলো স্কোয়াড পূর্ণ করবে। আইকন ক্রিকেটারদের বাইরে নিলাম থেকে খেলোয়াড় বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে প্রতিটি দল।
তিন সংস্করণে এক প্রতিযোগিতা
ডি থ্রি ট্রফির পরিকল্পনার মূল দিক হলো, একই কাঠামোর মধ্যে টি-টোয়েন্টি, এক দিনের এবং চার দিনের ক্রিকেট আয়োজন করা। প্রচলিত ঘরোয়া কাঠামোয় আলাদা সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া তিন সংস্করণের প্রতিযোগিতাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে চায় বিসিবি। এতে ক্রিকেটারদের বিভিন্ন সংস্করণে খেলার সুযোগ, দল গঠনের ধারাবাহিকতা এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে খেলোয়াড় নিলামের আগেই হয়েছে ম্যানেজমেন্ট ড্রাফট। গত মাসে দলগুলো প্রধান কোচ, সহকারী কোচ, ট্রেনার ও ফিজিও নির্বাচন করেছে। অর্থাৎ কেবল খেলোয়াড় সংগ্রহ নয়, প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কোচিং ও সহায়ক দলও পরিকল্পিতভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছয় দলের এই প্রতিযোগিতায় প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ২৩ সদস্যের স্কোয়াড গঠন করবে। আইকন ক্রিকেটারদের বাইরে বাকি খেলোয়াড়দের নিলামের মাধ্যমে বেছে নেওয়া হচ্ছে। এতে দলগুলোকে একদিকে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে তিন সংস্করণের উপযোগী ক্রিকেটারও সংগ্রহ করতে হবে।
আগামী ১৫ ডিসেম্বর টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হবে ডি থ্রি ট্রফি। এই সংস্করণের উদ্বোধনী ম্যাচ ও ফাইনালসহ বেশির ভাগ ম্যাচ হবে বরিশালে; মিরপুরে অনুষ্ঠিত হবে সাতটি ম্যাচ। জানুয়ারিতে হবে চার দিনের ক্রিকেটের আসর। আর ৫০ ওভারের প্রতিযোগিতা মাঠে গড়ানোর কথা আগামী বছরের মে মাসে।
তিন সংস্করণ মিলিয়ে মোট ৪২টি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে ১৯টি, এক দিনের ক্রিকেটে ১৬টি এবং চার দিনের প্রতিযোগিতায় সাতটি ম্যাচ হবে।
শরিফুল, তাসকিন ও তানজিদকে ঘিরে নিলামের উত্তাপ ডি থ্রি ট্রফির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। তবে এই আয়োজনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মাঠের প্রতিযোগিতা, খেলোয়াড়দের নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং তিন সংস্করণের টুর্নামেন্ট সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ওপর। পয়েন্টভিত্তিক নিলামের এই নতুন কাঠামো ঘরোয়া ক্রিকেটে কতটা ভারসাম্য ও দর্শক-আগ্রহ তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।