পানির লাইন কেটে তরল ঢালার দাবি পুলিশের, অসুস্থ কয়েকজন; নমুনা পাঠানো হয়েছে পরীক্ষাগারে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরের আলী নগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে সরবরাহ করা পানিতে ‘বিষাক্ত তরল’ মেশানোর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ধারণা, ক্যাম্পে পানি সরবরাহের লাইন কেটে সেখানে বিষাক্ত তরল জাতীয় কোনো পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ওই পানি ব্যবহারের পর কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে।
রোববার সকালে আলী নগর স্কুলে স্থাপিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের সদস্যরা পানি ব্যবহারের সময় অস্বাভাবিক গন্ধ পান। পরে পানির ট্যাংক পরীক্ষা করে তীব্র গন্ধ ও ফেনা দেখতে পান তারা। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের সব পানির কল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, পানিতে অস্বাভাবিক গন্ধ পাওয়ার পর কয়েকজন সদস্য ওই পানি দিয়ে কুলকুচি করেন এবং চোখ-মুখে পানি দেন। পরে তাদের কয়েকজনের পেটের পীড়া ও চোখ জ্বালাপোড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা ওই পানি দিয়ে কুলকুচি করেছিল এবং চোখে-মুখে পানি দিয়েছিল, তাদের পেটের পীড়া ও চোখ জ্বলেছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর পানিতে কী ধরনের পদার্থ মেশানো হয়েছিল এবং তা কতটা ক্ষতিকর ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পানির লাইন কেটে তরল ঢালার সন্দেহ
অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, আলী নগর এলাকায় রাস্তার পাশ দিয়ে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ পানির লাইন রয়েছে। ওই লাইন থেকে বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্কুলে পৃথক পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, আলী নগর স্কুলে প্রবেশ করা পানির সংযোগস্থলে পাইপ কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পাইপটি কেটে সেখানে বিষাক্ত তরল জাতীয় কোনো পদার্থ ঢেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। পরে সেটি পানির সঙ্গে মিশে স্কুলের পানির ট্যাংকে পৌঁছেছে।
তবে পানিতে ঠিক কী ধরনের পদার্থ মেশানো হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের পরই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় স্কুলের বাথরুম বন্ধ
পানিতে অস্বাভাবিক গন্ধ ও ফেনা দেখা দেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানান। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্কুলের সব বাথরুমের পানির সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, ‘পানিতে গন্ধ ও ফেনা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা স্কুলের শিক্ষকদের জানিয়ে দিয়েছিলাম। স্কুলের শিক্ষার্থীদের সব বাথরুমও বন্ধ করে দিয়েছি, যাতে কোনো শিক্ষার্থী এ পানি ব্যবহার করতে না পারে।’
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়নি। তবে ক্যাম্পে অবস্থানরত কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পানি ব্যবহারের পর অসুস্থ বোধ করেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
আলী নগরে অস্থায়ী ক্যাম্প
সীতাকুণ্ডের জঙ্গল ছলিমপুর ও আলী নগর দীর্ঘদিন ধরে দখলদারিত্ব ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে প্রশাসনের জন্য স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত। ওই এলাকায় সরকারি খাসজমি দখল করে বসতি গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। আলী নগর ও জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধার মুখে পড়েছে।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল আলী নগর এলাকায় অভিযানে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
এরপর গত ৯ মার্চ স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য অংশ নেন। অভিযানে হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াডসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়।
অভিযানের পর আলী নগর স্কুলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রিজার্ভ রেঞ্জ পুলিশ (আরআরএফ) ও র্যাবের শতাধিক সদস্য অবস্থান করছিলেন।
এ ছাড়া স্কুল থেকে কয়েকশ গজ দূরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য একটি স্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণের কাজ চলছিল।
নির্মাণাধীন ক্যাম্পেও হামলা
এর আগে গত ২৪ মে গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নির্মাণাধীন ক্যাম্পে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হামলাকারীদের গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।
সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যেই অস্থায়ী ক্যাম্পে পানি সরবরাহের লাইনে হস্তক্ষেপ এবং পানিতে সন্দেহজনক পদার্থ মেশানোর অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয়ভাবে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলী নগর এলাকায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। ওই পানির উৎস থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন বসতবাড়ি ও স্থাপনায় পানি সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি সমিতির মাধ্যমে পানি, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবা ব্যবস্থাপনার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর কাছ থেকে পানি ও অন্যান্য সেবার জন্য নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়।
তবে এসব ব্যবস্থাপনা এবং পানির লাইন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্তর্ঘাতের অভিযোগে মামলা প্রস্তুতি
আলী নগর স্কুলের ক্যাম্পে পানিতে বিষাক্ত তরল মেশানোর অভিযোগে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ। সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলমগীর হোসেন বলেন, ঘটনাটি ‘অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম’ হিসেবে বিবেচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পানির লাইন কাটার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে পানিতে কোনো পদার্থ মেশানো হয়েছিল—তা খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি পানির লাইনের সংযোগস্থলও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় থাকা কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
তদন্ত ও পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষা
পানিতে আদৌ কোনো বিষাক্ত বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়েছিল কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশের ধারণার ভিত্তিতে ‘বিষাক্ত তরল’ মেশানোর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে পানির নমুনা পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞ পরীক্ষায় পানির নমুনায় কোনো রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃতি আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে পানির পাইপ কাটা এবং সেখানে কোনো পদার্থ ঢালার অভিযোগেরও তদন্ত প্রয়োজন হবে।
পুলিশ বলছে, ঘটনাটি পরিকল্পিত নাশকতা বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির উৎসে এমন ঘটনা ঘটায় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
এদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পানির নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ।