আল-কায়েদা বাংলাদেশে ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে: জাতিসংঘ

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা বাংলাদেশে সক্রিয় সেল গঠনের মাধ্যমে তাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’।

গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত নিরাপত্তা পরিষদের ওই পর্যবেক্ষণ দলের ৩৮তম প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস এখন আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নিচ্ছে। বড় আকারের ইউনিটের পরিবর্তে সংগঠনটি ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একিউআইএস দেশটিতে সক্রিয় সেল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে—এমন উদ্বেগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে সংগঠনটির কতগুলো সেল রয়েছে বা তাদের কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট ধরন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এই পর্যবেক্ষণ দলটি আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ত বা আইএসআইএলসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম, সক্ষমতা ও হুমকি পর্যবেক্ষণ করে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে সংগঠন দুটির সম্ভাব্য রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা ও আইএসআইএল দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা অর্জনে তারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

আইএসআইএলের কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ভারতের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এক চিকিৎসকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে আইএসআইএলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ‘রাইসিন’ নামের অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

সিরিয়াতেও আইএসআইএল রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গৃহযুদ্ধের পর বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে পড়ে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সংগঠনটি। এ কাজে সহায়তার জন্য তারা একজন রাসায়নিক প্রকৌশলীকে অপহরণ করেছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সিরিয়ায় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০২৪ সালে বিদ্রোহীদের কাছে পরাজিত হয়ে দেশ ছাড়েন বাশার আল-আসাদ। এর আগে গৃহযুদ্ধের সময় সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল আইএসআইএল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আইএসআইএলের কার্যক্রম নিয়েও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে মূল্যায়ন রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অঞ্চলটিতে আইএসআইএল এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলোর সামগ্রিক সক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। তবে সংগঠনটি এখনো ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেল, উগ্রবাদে আগ্রহী ব্যক্তি, অনলাইনভিত্তিক নিয়োগ এবং মতাদর্শে অনুপ্রাণিত বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার একটি সন্ত্রাসী হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর সিডনির বন্ডি বিচে ইহুদিদের হানুক্কা উৎসবের একটি অনুষ্ঠানে বন্দুক হামলায় ১৬ জন নিহত হন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে সন্দেহভাজনদের আইএসআইএলের মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলেও ভ্রমণ করেছিলেন।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দল বলছে, আল-কায়েদা ও আইএসআইএলের মতো সংগঠনগুলোর কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। বড় ও দৃশ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট সেল, অনলাইন যোগাযোগ, স্থানীয় সহযোগী এবং অর্থ ও রসদ সরবরাহের নেটওয়ার্কের ওপর তারা বেশি নির্ভর করছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট দেশে তাদের উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং কার্যক্রমের বিস্তার ঠেকানো নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশকে ঘিরে একিউআইএসের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের যে আশঙ্কা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলোকে হুমকির মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে; বাংলাদেশে সংগঠনটির কথিত সেল বা নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রমের বিষয়ে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত