রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন ফখরুল, শূন্য পদে কে? মন্ত্রিসভায়ও কি রদবদল

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
ফাইল ছবি ছবি:
ফাইল ছবি ছবি:

সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে একসঙ্গে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ শূন্য হবে। একই সময়ে সরকার গঠনের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রিসভার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে রদবদলের আলোচনাও জোরালো হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাকে এই পদ ছাড়তে হবে। ফলে মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব কে পাবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিএনপির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। ওই বৈঠকেই তিনি দলের মহাসচিব ও সরকারের মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে নির্বাচন কমিশনে তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আগামী ২০ আগস্টের নির্বাচনে তার জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদটি আপাতত ভারপ্রাপ্ত কাউকে দিয়ে পরিচালনার সম্ভাবনাই বেশি। দলের ভেতরে এ পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থাকা এবং দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে রিজভীকেই স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন বিএনপির অনেক নেতা।

দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যের ভাষ্য, আগামী জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো হতে পারে। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচন করা হবে।

মির্জা ফখরুলের সরকারের পদটি নিয়েও বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। বর্তমানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। তাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কে আসবেন, তা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির আরেক নেতা শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানির নাম আলোচনায় রয়েছে। বর্তমানে তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেউ কেউ বলছেন।

তবে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়টি শুধু মির্জা ফখরুলের পদ পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পর একাধিক মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসতে পারে বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বুধবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “মন্ত্রণালয়ে রদবদল সরকারের একটি স্বাভাবিক কার্যক্রম। এ নিয়ে মন্তব্যের সুযোগ নাই।”

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে যিনি আসবেন, তিনি যদি পূর্ব কোনো পদে থাকেন, তাহলে তো পদত্যাগ করবেন। সেখানে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।”

সরকারের দুই মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়তে পারেন। পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার মতে, ছয় মাসের মাথায় মূল্যায়ন করে কাউকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট মনোভাব দেখা যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস হতে পারে।

সরকারের একজন মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তত সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে মন্থর। এসব মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। যেসব মন্ত্রীর হাতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের কারও কারও দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ওই মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীকে ডেকে তাদের কাজ নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন এবং কাউকে কাউকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য সময়ও বেঁধে দিয়েছেন। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যও মনে করেন, মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বাস্তবসম্মত। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কোনো কোনো মন্ত্রী নিজেদের মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি তুলে ধরেছেন বলেও জানান তিনি।

সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আগামী ১৭ আগস্ট। এ সময়ের কর্মকাণ্ড, অর্জন ও সীমাবদ্ধতা পর্যালোচনার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করছে। ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন শেষে প্রধানমন্ত্রী সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

এর আগে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের কোনো রদবদল হয়নি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সরকারের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। মন্ত্রিসভা পুনর্বিন্যাস হলে কোনো কোনো মন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে, কেউ বাদ পড়তে পারেন, আবার কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, “যা আলোচনা চলছে মিডিয়াতে, কে পূর্ণ হবেন, কে আসবেন, যাবেন; এসব নিয়ে কোনো কিছু বলতে পারছি না।”

মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার আলোচনাও রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর কয়েকজন নেতার নাম সামনে এসেছে। গণঅধিকার পরিষদের নূরুল হক নুর ও গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ইতিমধ্যে সরকারের অংশ। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

এর বাইরে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতে পারে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। তবে দুজনই এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আলোচনা এখন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, সেটা নিয়ে। মন্ত্রিসভায় এখনই রদবদলের কোনো তথ্য তো পাইনি। আর আমার কথা তো মিডিয়াতেই শুনছি।”

সাইফুল হক বলেন, “গুঞ্জন নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।”

সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাত্রার সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো এবং সরকারের মন্ত্রিসভায় একাধিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদে কারা আসবেন এবং মন্ত্রিসভায় আদৌ কতটা পরিবর্তন হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত