পরাজয় জেনেও কেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিল জামায়াত জোট?

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এমন বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা ২৪৭। ফলে সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এর সঙ্গে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন—এমনটাই ধরে নেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়া কি কেবল নিয়ম রক্ষার অংশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল—এ প্রশ্নই এখন আলোচনায়।

বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের বিপরীতে আওয়ামী লীগ বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল। এরপর গত ৩৫ বছরে আরও আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবার একাধিক প্রার্থী থাকায় সেই ধারায় পরিবর্তন আসছে।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। আর ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট গ্রহণ শেষে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দেয় জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধি দল।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “গণতন্ত্রকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতেই” তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা এখানে জিতব কি হারব—এটা বিষয় নয়। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া কোনো নির্বাচন হোক সেটা চাই না। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।” হামিদুর রহমান আযাদ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত ও ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “আর্টিকেল ৭০ এ অনাস্থা এবং অর্থবিল ছাড়া সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারবেন, ভোট দিতে পারবেন—ঐকমত্য কমিশনে এই বিষয়ে আমরা সবাই চেয়েছি। কিন্তু একগুঁয়েমি এবং দলীয় সংকীর্ণতার কারণে গণভোটের রায় উনারা বাস্তবায়ন করছেন না।” সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএনপির দলীয় ফোরামের বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “সচিবালয় হলো একটা নির্বাহী জায়গা, এখানে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ফোরামের বৈঠক হবে এরকম অতীতের রেকর্ড আমাদের জানা নেই।”

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি কোনোভাবেই নিয়ম রক্ষার নির্বাচন নয়। সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী যেটা হওয়ার সেটাই হচ্ছে।” দুপুরের পর বিএনপির প্রতিনিধিদলও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা না থাকলেও জামায়াত জোটের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রতীকী অংশগ্রহণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে জোটটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্ত করতে চাইতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জামায়াত জোটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হতে পারে। তিনি বলেন, “জামায়াত ভোটে জিতবে না এটা তারাও জানে, কিন্তু তাদের জন্য এটা একটা বড়ো পলিটিক্যাল গেইন বা অর্জন যে তারা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তাদের প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে।” অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে জামায়াত জোট নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্তকে কাজে লাগাতে পারে জোটটি।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ একটি পদ হওয়ায় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগে থেকেই আলোচনা ও ঐকমত্য থাকা ভালো ছিল। তিনি মনে করেন, বিএনপি রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণার আগে বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা করলে জামায়াত জোট হয়তো আলাদা প্রার্থী দিত না। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে দুই পক্ষের মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্য এবং সংলাপের যে পরিবেশটা থাকা দরকার ছিল সেটা আর নাই।” 

ফলে অলি আহমদের প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে না পারলেও রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব কম নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সংসদে নিজেদের অবস্থান ও বিরোধিতার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে প্রার্থী করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিসর বাড়ানোর চেষ্টাও করছে।

১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকছে। ভোটের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক, বিরোধী রাজনীতির কৌশল এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে ঐকমত্যের রাজনীতি কতটা কার্যকর হবে—সে প্রশ্ন সামনে এনেছে।

এলাকার খবর

সম্পর্কিত