জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে সংগঠনের শীর্ষ ছয় নেতা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ওই বৈঠকে বর্তমান কমিটির কর্মকাণ্ডের জন্য ছাত্রদলকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে—এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে এ বৈঠক হয়। এতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান ও দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত দুজন ছাত্রদল নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদলের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সংগঠনের বর্তমান কমিটির কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট বলেও জানান। একই সঙ্গে সারা দেশে গড়ে তোলা ২ হাজার ২০০-এর বেশি সাংগঠনিক কমিটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পরামর্শ দেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক যুগ্ম সম্পাদক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি তিনি তাদের আগামী দিনের রাজনীতির জন্য শুভকামনা দেন। তিনি ছাত্রদলের কার্যক্রমে ‘সন্তুষ্ট’ বলে তুলে ধরেন।’
ওই নেতা বলেন, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং নতুন কমিটি করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
বৈঠকে পরবর্তী কমিটির নেতৃত্ব নিয়েও নেতাদের কাছ থেকে ‘গোপন’ মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানান আরেক নেতা। তাঁর ভাষ্য, ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের অবহিত করেছেন। শিগগিরই নতুন কমিটি আসবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বৈঠকের পর মধ্যরাতে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের একটি ফেসবুক পোস্টেও বিদায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’ তিনি ‘নতুন জীবন’ শুরু করতে চাওয়ার কথা জানিয়ে নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, তাঁরা রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংগঠনের সভাপতি রাকিবের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহসভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এ কমিটির অধীনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা, মহানগর ও মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠন করা হয়।
২০২৬ সালের ১ মার্চ বর্তমান কমিটির দুই বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়। এরপর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সংগঠনের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বর্তমান কমিটি ও নতুনদের মিলিয়ে অন্তত ১০ জনের বেশি নেতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার প্রত্যাশায় রয়েছেন। তাঁদের অনেকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের প্যানেল পরাজিত হওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সময় বর্তমান নেতারা এসব ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেন বলে বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা জানিয়েছেন।
ছাত্রদলের নতুন কমিটি কবে ঘোষণা হবে, তা নিয়ে অবশ্য নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের দাবি, সবকিছু ঠিক থাকলে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে। কেউ কেউ ১৭ আগস্টের মধ্যেই কমিটি হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন। আবার সময় আরও পিছিয়ে গেলে সেপ্টেম্বরেও কমিটি ঘোষণা নাও হতে পারে বলে সংগঠনের নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে শেষ মুহূর্তে পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও চলছে।
ছাত্রদলের সভাপতি পদে ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের আনোয়ার পারভেজ ও শ্যামল মালুমের নাম আলোচনায় রয়েছে। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের রিয়াদ রহমান, এইচ এম আবু জাফর, এজাজুল কবির রুয়েল ও মঞ্জুরুল আলম রিয়াদও আলোচনায় আছেন। এ ছাড়া ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের মমিনুল ইসলাম জিসান, আমানুল্লাহ আমান ও ফারুক হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের তরিকুল ইসলাম তারিক ও আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নাম আলোচনায় রয়েছে। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল ও তারেক হাসান মামুনও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনের নামও সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘যেকোনো সময় ছাত্রদলের নতুন কমিটি আসতে পারে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বর্তমান কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী, যিনি ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক; তিনি দক্ষতা, ত্যাগ, দলের প্রতি আনুগত্য এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে নতুন কমিটি দেবেন।’
নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার বিষয়টি সামনে আনছেন পদপ্রত্যাশীরাও। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব, সিট বাণিজ্য ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের কারণে ছাত্ররাজনীতির মূলধারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও শোষণই গণঅভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হতে হবে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য। ছাত্রনেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কল্যাণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে।’
রিয়াদ রহমান আরও বলেন, ‘ক্যান্টিনে পর্দা টাঙানোর মতো প্রতীকী উদ্যোগ নয়, বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানই ছাত্রসংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। নেতৃত্ব এমন ব্যক্তির হাতে যেতে হবে, যিনি সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন, নিজের সংগঠনের ভুলের সমালোচনা করার সাহস রাখবেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবেন।’
ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান সহসভাপতি এইচ এম আবু জাফর বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁরা সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি শতভাগ আস্থাশীল। তাঁর বিশ্বাস, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়, শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি করা এবং দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল নেতাদের মধ্য থেকেই নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, ‘নতুন নেতৃত্ব ও নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশের ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। আশা করছি, সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি উপহার দেবেন।’
নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনার মধ্যে ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ের বার্তাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে বর্তমান নেতৃত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানানো এবং নতুন কমিটি দ্রুত দেওয়ার ইঙ্গিতের পর এখন মূল প্রশ্ন—ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদে কারা আসছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব শুধু সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বিএনপির সামগ্রিক সাংগঠনিক কৌশল ও রাজনৈতিক বার্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।