চোখের জলে, শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় বিদায় ‘আপসহীন নেত্রী’র*
যাদের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিতে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন—ঠিক সেই মানুষের চোখের জল, দোয়া আর ভালোবাসার সাগরে ভেসেই শেষ বিদায় নিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উপস্থিতি রূপ নেয় জনসমুদ্রে—যার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ পেরিয়ে আশপাশের প্রতিটি সড়ক, অলিগলি আর খোলা প্রান্তরে।
জাতীয় সংসদ থেকে মানিক মিয়া—সবখানেই শোকের ঢল
জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ, দক্ষিণ প্লাজা, মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ—সবখানেই মানুষ আর মানুষ। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা অগণিত নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-তরুণ দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে, চোখ ভেজা, বুক ভারী করে।
নারীদের জন্য রাখা হয় আলাদা ব্যবস্থাপনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও আবেগ সামলাতে পারছিলেন না অনেকেই। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু, কারও ঠোঁটে শুধু একটি বাক্য—
“আপসহীন নেত্রী, বিদায়।”
তারেক রহমানের কণ্ঠে শেষ আরজি
জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আবেগ সংবরণ করে তিনি বলেন—
“আমি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। আজ এখানে উপস্থিত সকল ভাই ও বোনদের কাছে আমার অনুরোধ—মরহুমা যদি জীবিত থাকাকালে আপনাদের কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ।”
এরপর কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে আসে— “আর উনার কোনো কথা বা আচরণে কেউ যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন—আল্লাহ তাআলা যেন উনাকে বেহেশত নসিব করেন।”
এই মুহূর্তে জনসমুদ্রে নেমে আসে এক গভীর নীরবতা—শুধু কান্নার শব্দ আর দীর্ঘশ্বাস।
রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ—এক কাতারে
জানাজা পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। পুরো আয়োজন সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাম পাশে দাঁড়ান তারেক রহমান। তার পাশে ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার।
ডান পাশে দাঁড়ান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
উপস্থিত ছিলেন সরকারের উপদেষ্টারা, প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সব সদস্য, জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। জানাজায় দেখা যায় কবি ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারকেও।
দেশ-বিদেশের শোক ও সম্মান
খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জানাজায় উপস্থিত হন বিদেশি অতিথিরাও। তাদের মধ্যে ছিলেন—
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি. এন. ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও জানাজায় অংশ নেন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে
এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা। ৪৪ বছর পর, ঠিক সেই স্থানেই আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি—স্বামীর পাশে চিরনিদ্রায় যাওয়ার আগে জাতির শেষ শ্রদ্ধা গ্রহণ করলেন খালেদা জিয়া।
এক যুগের অবসান
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে, বুধবার দেওয়া হয় সাধারণ ছুটি।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন এক অনিবার্য নাম। ৪১ বছর বিএনপির নেতৃত্ব, পাঁচবার সংসদ সদস্য, তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন—এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক।
আজ তিনি নেই। কিন্তু জাতীয় সংসদের সামনে এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে দিল—
খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ছিলেন মানুষের অধিকার আদায়ের এক জীবন্ত ইতিহাস।