বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো আশাবাদী নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত। গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এসব কথা বলেন।
তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, নির্দিষ্ট এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা সাংবাদিকদের জানানো হবে। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের জন্য আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর আগে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও বলেছিলেন, তারেক রহমানের ভারত সফর পুরোপুরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে নয়াদিল্লি তাঁকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছে এবং সফরটি দ্রুত হবে বলে আশা করছে।
ভারতের আমন্ত্রণের বিষয়ে ঢাকার অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া ভারতের আমন্ত্রণ সরকার পর্যালোচনা করছে। জুলাইয়ে ভারত প্রথমে তাঁকে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়া হলে সেটিই হতে পারে তাঁর প্রথম ভারত সফর।
তবে সফরটি নিয়ে অনিশ্চয়তার পেছনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার পর থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য নয়াদিল্লির কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। গত মঙ্গলবার জয়সওয়াল বলেন, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ ভারতের প্রচলিত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানে নতুন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক দিল্লির সংবাদ সম্মেলন নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশের বিষয়টি ব্রিফিংয়ে উঠে আসে। এ বিষয়ে জয়সওয়াল বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ভারতের অবস্থান নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রত্যর্পণের অনুরোধ নির্ধারিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
এদিকে তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত সোমবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। পরে তিনি দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ঢাকায় তাঁর বিভিন্ন বৈঠকের বার্তা পৌঁছে দেন। ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জাগো নিউজের ইংরেজি সংস্করণ জানিয়েছে, ত্রিবেদী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী’ করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ, পারস্পরিক সুবিধা ও জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সার্বভৌম সমতা’ ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম *ইন্ডিয়া টুডে* জানিয়েছে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের সম্পর্কের কিছু ‘বিরক্তিকর বিষয়’ বা অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিও ভবিষ্যৎ আলোচনায় আসবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টিও মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে উঠে আসে। বাংলাদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির অনুরোধ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জয়সওয়াল বলেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে। ভারতের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা এবং জ্বালানির প্রাপ্যতা বিবেচনা করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই দেশের অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও ভারতের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং পানি নিয়ে যেকোনো আলোচনা বা সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় যৌথ নদী কমিশন কিংবা বিদ্যমান নির্দিষ্ট সংলাপ কাঠামোর মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু এখনো অমীমাংসিত। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থার প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত অবশ্য নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে সংঘাতের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। এপ্রিলেও তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দুই দেশের সহযোগিতাকে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী’ করার ভারতের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এখন শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির একাধিক বিষয় জড়িয়ে আছে। নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ বহাল রেখে আশাবাদী থাকার কথা জানালেও, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে ভারত সফরে যাবেন, সে সিদ্ধান্ত এখন ঢাকার হাতেই।