বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্রুত একটি বৈঠক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন ঢাকা হোটেলে ভারতের ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দীনেশ ত্রিবেদী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সরাসরি দিল্লি যান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘তিনি (নরেন্দ্র মোদি) আমাকে একটি বিষয় বলেছেন—আমাদের বসতে হবে। আপনারা তাঁকে আমার পক্ষ থেকে বলে দিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস তাঁর জন্য রয়েছে যে, তিনি ভারতে এলে প্রাপ্য সম্মানজনক অভ্যর্থনা পাবেন। যেভাবে অন্য যেকোনো প্রধানমন্ত্রী পেয়ে থাকেন। আর এটি হবে খুবই স্মরণীয় একটি সফর, যা জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কল্যাণ বয়ে আনবে।’
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীই প্রথম তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তিনিই প্রথম তাঁকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’ এরপর ভারতের লোকসভার স্পিকার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছেন।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমি আপনাদের বলতে চাই, তিনি একজন জনতার মানুষ। তাঁকে অভিনন্দন। তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা ও মতপার্থক্য থাকার কথা স্বীকার করে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এসব সমস্যা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে দুর্বল করা উচিত নয়। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। পরিবারের মধ্যেও মতপার্থক্য থাকে, তাই বলে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় না।
ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে সেখানে অনেক জটিলতা রয়েছে। আমি মনে করি, এটা খুবই স্বাভাবিক। এটা পরিবারেও ঘটে। তার মানে এই নয় যে আমরা দূরে সরে যাই।’ দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব বিষয়কে দুই দেশেরই লালন করা উচিত।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমি বলছি না যে আপনারা অতীত ভুলে যান। কিন্তু অতীতকে রাখুন এবং অতীতের মতপার্থক্যগুলো মিটিয়ে ফেলুন। কিন্তু এগিয়ে যান। স্থবির হয়ে থাকবেন না এবং শুধু এগিয়ে চলুন।’
দুই দেশের দূরত্ব কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে সমস্যা আছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী বসলে সেই সমস্যাগুলো সমাধান হতে পারে। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’
ঢাকায় তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে ঢাকায় কেন পাঠিয়েছেন, তার কারণ খুবই সাধারণ। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, অনুরাগ ও প্রতিবেশী হিসেবে পরস্পরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে এবং আমি যখন চাই তখনই তাঁকে ফোন করতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন, কারণ আমাদের খুব সম্মান রয়েছে, আমাদের খুব অনুরাগ রয়েছে এবং প্রতিবেশীর কাছে আমাদের অনেক প্রয়োজন রয়েছে।’
বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, এসব উদ্বেগ গভীরভাবে উপলব্ধি করে ভারত। তবে তিনি মনে করেন, সমতার ভিত্তিতে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব উদ্বেগ দূর করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই উদ্বেগগুলো কেবল তখনই প্রশমিত হতে পারে, যখন আপনি বৈঠকে বসবেন।’
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথাও তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে ভারতীয় পক্ষ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘এটা একটা নতুন বাংলাদেশ। আর এই নতুন বাংলাদেশে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। তরুণরাও অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছে।’ তাঁর মতে, দুই দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং তরুণদের সামনে সুযোগ তৈরি করা।
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁর মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। গত কয়েক বছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এই বাণিজ্য এখনো কাঠামোগতভাবে ভারসাম্যহীন এবং প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং দুই দেশের বাণিজ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করা। পণ্য ও সেবার অবাধ প্রবাহের পথে অশুল্ক বাধা, মান ও পরীক্ষাসংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সিআইআইয়ের মহাপরিচালক চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে তাঁরা যে উষ্ণতা পেয়েছেন এবং বাংলাদেশের শিল্প খাত যে আন্তরিকতা দেখিয়েছে, তা অসাধারণ। দুই দেশের মধ্যে আরও ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সম্পর্কের এই উষ্ণতা ও সহযোগিতার ধারা বজায় রাখতে সিআইআই কাজ করবে বলে জানান তিনি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরীসহ ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।