ভালো সম্পর্ক হলে উভয় দেশের জন্য ‘উইন-উইন’: দীনেশ ত্রিবেদী

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ইস্যু থাকবেই, তবে আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধপূর্ণ বিষয় থাকলেও ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেগুলোর সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, দুই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই— বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভালো থাকুক। আর সম্পর্ক ভালো থাকলে উভয় দেশই লাভবান হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন কোনো ইস্যু নেই, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার (১০ আগস্ট) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যু বা মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ইস্যু থাকবেই। তবে কোনো সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বাইরে নয়। তিনি বলেন, “গণতন্ত্রে ইস্যুজ (বিরোধপূর্ণ বিষয়াদি) থাকবেই। ইস্যুজ না থাকলে ওটা গণতন্ত্র না। আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই—ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হলে উইন-উইন সিচুয়েশন।”

‘প্রতিবেশী ও ইতিহাস বদলানো যাবে না’
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে ভারতীয় হাই কমিশনার বলেন, দুই দেশের এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, “এটা আমাদের ঐতিহাসিকভাবে আছে, এটা তো আপনি বদলাতে পারবেন না। প্রতিবেশী তো বদলাতে পারবেন না, ইতিহাস বদলাতে পারবেন না।”

দুই দেশের মধ্যে যেসব বিরোধপূর্ণ বিষয় রয়েছে, সেগুলো পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমরা শুধু সীমান্ত ভাগাভাগি করি না, আমরা স্বপ্নও ভাগ করি।”

তিনি আরও বলেন, আগামী দিনগুলো নিয়ে তিনি আশাবাদী। দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দুই পক্ষকেই সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে হবে। 
“ইস্যুজটা শর্ট-আউট করতেই হবে, দুদিক থেকে। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী। খুবই ভালো লাগল, উনার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে দেখা হল,” বলেন তিনি।

‘কোনো ইস্যু এমন নয়, যা সমাধান করা যাবে না’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপড়েন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের মধ্যে ইস্যু বা মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, “ইস্যুজ না থাকলে তো গণতন্ত্র থাকবে না। আপনি-আমি, বাড়িতেও তো ইস্যু থাকে।”

দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “কোনো ইস্যু এমন না— যেটা আমরা বসে সমাধান করতে পারি না।”

তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক দেশ এবং দুই দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটিও অভিন্ন, “দু-দেশের ভাইব্রেন্ট ডেমোক্রেসি... ভারতের সাধারণ মানুষ, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একই জিনিস চায়—সম্পর্ক ভালো হোক। এটা স্বাভাবিক,” বলেন তিনি।

মোদির ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ সম্পর্কেও ধারণা দিলেন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার তাকে কেন বাংলাদেশে হাই কমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে—সাংবাদিকদের প্রশ্নের আগেই সে বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেন, “আমার এখানে আসা... আমার প্রধানমন্ত্রী তো আমাকে সবসময় এটা বলেছেন যে, ‘সম্পর্ক ভালো থাকা বিশেষ দরকার’।”
তার এই বক্তব্য থেকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও স্বাভাবিক করাকেই ঢাকায় তার দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দুই মাস পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গত ১২ জুন বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে ঢাকায় আসেন দীনেশ ত্রিবেদী। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি।

সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বেলা ১১টার দিকে তাদের সাক্ষাৎ হয়। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষাৎকে সৌজন্য বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা জানান, সেখানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, তিনি তারেক রহমানকে জনসম্পৃক্ত একজন নেতা হিসেবে দেখেছেন।

তিনি বলেন, “আপনাদের প্রধানমন্ত্রী... উনি জনতার লোক। আর খুবই ভালো লাগল। উই মেট মোর অ্যাজ এ পাবলিক ফিগার। আমি কূটনীতিক নই। এটা জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে জনগণের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা।” প্রথম সাক্ষাতেই দীর্ঘদিনের পরিচিতির মতো অনুভূতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একদম দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়নি যে— উনার সঙ্গে আমি প্রথমবার দেখা করেছি। ভালো, খুবই হাম্বল। অন্য দ্য গ্রাউন্ড।”

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাই কমিশনার। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

সম্পর্ক মেরামতের নতুন পর্ব?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা মিশন শুরু হয়। সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে বাংলাদেশে হাই কমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে ভারত।

ফলে তার নিয়োগকে শুরু থেকেই দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার পরপর দুটি বৈঠক এবং সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে সম্পর্কের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তাতে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।

তবে সম্পর্কের বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করবে সীমান্ত, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, ভিসা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের আলোচনার ফলাফলের ওপর।

দীনেশ ত্রিবেদীর ভাষায়, “কোনো ইস্যু এমন না—যেটা আমরা বসে সমাধান করতে পারি না।” এখন সেই আলোচনাকে বাস্তব সমাধানে কতটা রূপ দেওয়া যায়, সেটিই হবে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত