রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বৈদ্যুতিক রিকশা চলাচলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে নিবন্ধিত এবং সর্বোচ্চ চারজন যাত্রী বহনে সক্ষম বৈদ্যুতিক রিকশা নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচল করতে পারবে। এ জন্য ঢাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত নীতিমালা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত নীতিমালাটি জারি করা হবে বলে জানান তিনি। রোববার সচিবালয়ে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহদ শুহাদা ওথমানের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। মীর শাহে আলম বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই তা আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা ফিরে এলে এক সপ্তাহ বা পরের সপ্তাহের মধ্যেই তা জারি করার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। নীতিমালা জারি হলে বৈদ্যুতিক রিকশা, প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, চার্জিং স্টেশন এবং চালাচলের এলাকা—সবকিছুকেই একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। তবে এই নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বর্তমানে রাস্তায় চলাচলরত বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা যায়। একই সঙ্গে চালকদের জীবিকা, যাত্রীদের স্বল্প খরচের পরিবহন সুবিধা এবং রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রধান সড়কে চলবে না, অভ্যন্তরীণ সড়কে চলবে
মীর শাহে আলম বলেন, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে বৈদ্যুতিক রিকশা চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে নির্ধারিত অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সড়কে এসব যান চলতে পারবে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রধান সড়কে বৈদ্যুতিক রিকশা চলতে দেব না। আমরা আটটি অঞ্চল তৈরি করব, যাতে এসব যানবাহন অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচল করতে পারে।’
প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকাকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটি অঞ্চল থাকবে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং চারটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হতে পারে। একটি অঞ্চলে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক রিকশা অন্য অঞ্চলে চলাচল করতে পারবে না। কোন সড়কে এসব যান চলবে, তা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে নির্ধারণ করবে। নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাতে যানগুলো চলাচল করতে না পারে, সে জন্য ভূ-সীমা নির্ধারণ প্রযুক্তি বা জিও-ফেন্সিং ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঢাকায় ছয় যাত্রীর বৈদ্যুতিক রিকশা নয়
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বৈদ্যুতিক রিকশার যাত্রী ধারণক্ষমতাকেও সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। রাজধানীতে দুই বা চারজন যাত্রী বহনে সক্ষম বৈদ্যুতিক রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে ছয়জন যাত্রী বহনে সক্ষম বৈদ্যুতিক রিকশা ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ—কোনো সিটি করপোরেশনেই নিবন্ধনের জন্য যোগ্য হবে না। মীর শাহে আলম বলেন, ‘ঢাকায় বৈদ্যুতিক রিকশায় দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। ছয় যাত্রী বহনকারী কোনো যানবাহন বা বৈদ্যুতিক রিকশাকে ঢাকার সিটি করপোরেশনগুলোর নিবন্ধন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে না।’ তবে গ্রামাঞ্চল ও জেলা শহরের গ্রামীণ সড়কে দুই, চার অথবা ছয়জন যাত্রী বহনে সক্ষম বৈদ্যুতিক রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে।
নিবন্ধনের আগে প্রকৌশলগত সনদ
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বৈদ্যুতিক রিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। কোনো যান নিবন্ধনের আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অথবা জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল বিভাগ থেকে সনদ নিতে হবে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক বিভাগ থেকে যানটির ফিটনেস সনদও নিতে হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বুয়েট, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অটোমোবাইল বিভাগ থেকে সনদ এবং ট্রাফিক বিভাগ থেকে ফিটনেস সনদ ছাড়া আমরা কোনো নিবন্ধন দেব না।’ সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা বৈদ্যুতিক রিকশার নিবন্ধন দেবে।
যত্রতত্র রিকশা তৈরির কারখানা নিয়ন্ত্রণে আসবে
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই বৈদ্যুতিক রিকশা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তবে দেশে এ ধরনের কারখানার সঠিক সংখ্যা সরকারের কাছে নেই। প্রস্তাবিত নীতিমালায় এসব কারখানাকেও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বুয়েট বা অন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নকশা অনুসারে বৈদ্যুতিক রিকশা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। এর ফলে অনুমোদনহীন নকশা, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৈদ্যুতিক রিকশা উৎপাদনের প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চার্জিং স্টেশনেও লাইসেন্স
বৈদ্যুতিক রিকশার পাশাপাশি চার্জিং কেন্দ্রগুলোকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। সরকার ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক রিকশা চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়া বাধ্যতামূলক করার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
কেন প্রধান সড়কে নিষেধাজ্ঞা
রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত ও বৈদ্যুতিক রিকশা চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যানজট, সড়ক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলের জন্য আলাদা রিকশা লেন তৈরি করা এবং যাত্রীদের সুশৃঙ্খলভাবে ওঠানামার ব্যবস্থা করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। এ কারণে সরকার প্রধান সড়কের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সড়কে এসব যান চলাচল সীমিত রাখার পরিকল্পনা করছে। তবে নীতিমালা কার্যকর হলে কোন কোন সড়ক প্রধান সড়ক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোনগুলো অভ্যন্তরীণ সড়ক হিসেবে নির্ধারিত হবে, সেটিই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।