“আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি—তা দিয়ে তোমায় কোনোদিন দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না—আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।”—প্রেম, দ্রোহ, ও সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের হৃদয় নিঙড়ানো অনুভূতিতে লেখা চিঠির অংশবিশেষ এটি। স্ত্রী নারগিসকে লেখা চিঠিতে তাঁর প্রতি অনুযোগ-অভিযোগের জবাব দিয়েছেন তিনি। নার্গিসের প্রতি নজরুলের গভীর আবেগের যে প্রকাশ এই চিঠিতে ঘটেছে, তা ব্যক্তিগত প্রেমের দলিলের বাইরে গিয়ে বাংলা পত্রসাহিত্যেরও এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে।
একসময় দূরে থাকা আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। সেই চিঠির ভাঁজে ভাঁজে থাকত শুকনো ফুল, পুরোনো দিনের গন্ধ, প্রিয় মানুষের হাতের ছোঁয়া। শব্দের ফাঁকে লুকিয়ে থাকত অভিমান, অপেক্ষা, ভালোবাসা আর না-বলা কত কথা। তাই চিঠি কখনো কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি ছিল না, চিঠি মূলত একজন মানুষের হৃদয়ের কাছে আরেকজন মানুষের হৃদয়ের পৌঁছে যাওয়া।
কালের বিবর্তনে চিঠির সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগ। মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা। তবু দ্রুত পৌঁছে যাওয়া বার্তা আর চিঠির মধ্যে কোথায় যেন এক গভীর পার্থক্য রয়ে গেছে। চিঠির কাগজে যে অপেক্ষা মিশে থাকে, হাতের লেখায় যে ব্যক্তিগত স্পর্শ থাকে, ভুল বানানেও যে আপনত্ব থাকে—ডিজিটাল বার্তায় তার সবটুকু ধরা পড়ে না।
এই কারণেই হয়তো চিঠি হারিয়ে গেলেও চিঠির প্রতি মানুষের আকর্ষণ হারায়নি। এখনো সমঝদার পাঠকেরা খুঁটে খুঁটে পড়েন কবি-সাহিত্যিকদের বিখ্যাত পত্রাবলি। তসলিমা নাসরিনকে লেখা রুদ্রের চিঠি কিংবা নার্গিসকে লেখা নজরুলের চিঠি আজও পাঠকের মনে আলোড়ন তোলে। তবে পত্রসাহিত্যে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের পত্রসংবলিত পুস্তকই পাঠের শীর্ষে। তাঁর চিঠিতে যেমন ব্যক্তিজীবনের নানা অনুভব ধরা পড়েছে, তেমনি ধরা পড়েছে সময়, সমাজ, প্রকৃতি ও জীবনকে দেখার এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি।
শুধু পত্রসাহিত্যেই নয়, বাংলা কবিতা ও গানের জগতেও ‘চিঠি’ হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের এক শক্তিশালী প্রতীক। প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ তাঁর ‘প্রস্থান’ কবিতায় প্রেয়সীর কাছে পত্র চেয়েছেন এভাবে—
“এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো৷
এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা
খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো৷”
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ভালো আছি ভালো থেকো।’ অবশ্য কবি এখানে চিঠি চেয়েছেন একটু ভিন্নভাবে। কিন্তু আকাশের ঠিকানায় চিঠি চাওয়ার সময় কি রুদ্র কখনো ভেবেছিলেন যে মানুষ সত্যিই একদিন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখবে! সময়ের বিবর্তনে আজ আমরা হাতেকলমে চিঠি না লিখলেও প্রতিনিয়ত অন্তর্জালে বার্তা পাঠাই। পৃথিবীর দূরতম প্রান্তেও মুহূর্তে পৌঁছে যায় আমাদের কথা। কিন্তু আমরা আকাশের ঠিকানায় কিংবা অন্তর্জালে যে সকল বার্তা পাঠাই, তা শুধু বার্তাই থেকে যায়। তাতে থাকে না আমাদের আবেগের ঘনত্ব কিংবা অস্তিত্বের অনুভব।
চিঠি শুধু গদ্যেই লেখা হয়নি, কবিতাতেও চিঠি হয়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র শিল্পরূপ। নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বীরাঙ্গনা’ পত্রকাব্য বাংলা সাহিত্যে আজ ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে এমন কিছু পত্রোপন্যাসও—‘মেমসাহেব’, ‘বাঁধন হারা’, ‘সবিনয় নিবেদন’ যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বান্ধবীকে লেখা পত্র থেকে সংকলিত বিনয় মুখোপাধ্যায়ের ‘দৃষ্টিপাত’ও বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। এসব রচনা প্রমাণ করে, চিঠি কখনো নিছক যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, সাহিত্যেও এটি হয়ে উঠেছে অনুভূতি প্রকাশের স্বতন্ত্র এক ভাষা।
আজকের দিনে হাতে লেখা চিঠি প্রায় হারিয়েই গেছে। প্রিয়জনের হাতে পৌঁছায় না ভুল বানানে লেখা কাগজ, খামের ভেতর থাকে না শুকনো ফুল, থাকে না ডাকপিয়নের অপেক্ষা। তার বদলে আছে ক্ষুদেবার্তা, ই-মেইল, ইনবক্স আর নোটিফিকেশন। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, সময় কমেছে, দূরত্বও যেন সংকুচিত হয়েছে। অথচ মানুষের ভেতরের সেই পুরোনো আকাঙ্ক্ষাটি রয়ে গেছে—কেউ একজন তাকে একটু সময় নিয়ে, একটু যত্ন করে, নিজের হাতে কিছু কথা লিখুক।
হয়তো এ কারণেই চিঠি হারিয়ে গেলেও তার জন্য আমাদের অপেক্ষা শেষ হয় না। কারণ আমরা আসলে কাগজের চিঠি চাই না, চাই সেই অনুভূতিটুকু, যেখানে শব্দের সঙ্গে মানুষটিও এসে পৌঁছায়। চাই এমন কিছু কথা, যা শুধু পড়া যায় না, অনুভব করা যায়।
চিঠির সেই আবেদনকে স্মরণ করে প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব চিঠি দিবস। বিশ্ব চিঠি দিবসে মহাদেব সাহার সেই আকুলতাকে নিজের করে নিয়ে আমরাও বলতে চাই—
“করুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও বোলো, ভালোবাসি।”
লেখক: নকীবুল হক
সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম কলাম লেখক ফোরাম, নোবিপ্রবি শাখা।
শু/আজা