নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে অনুমতি ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রিত এলাকা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন পরিচালনাগত তথ্যের ছবি, ভিডিও, স্কেচ বা দৃশ্যমান তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমেও এসব তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতির কথা বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কেপিআই’ বা কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন হওয়ায় এর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া বন্দরের সংবেদনশীল স্থাপনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নজরদারি সক্ষমতা, যোগাযোগব্যবস্থা, জাহাজ ও কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য সংবেদনশীল স্থাপনার ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ, স্কেচ তৈরি কিংবা দৃশ্যমান তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে কেপিআই ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট এলাকায় অনুমতিবিহীন কোনো কার্যক্রমকে কঠোরভাবে পরিহার করতে বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংরক্ষিত এলাকা, নজরদারি সক্ষমতা, স্থাপনার বিন্যাস ও পরিচালনাগত তথ্য প্রকাশ বা প্রচার ‘সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত’। এ ধরনের তথ্য অননুমোদিতভাবে প্রকাশের মাধ্যমে বন্দর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন, নিরাপত্তা বিধিমালা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রচলিত নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ এবং অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দেশনায় উল্লিখিত আইনের কোন নির্দিষ্ট ধারায় কোন ধরনের ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং কী ধরনের শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে, তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে নির্দেশনার আইনি পরিধি ও প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২সহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির আলাদা তালিকাও রয়েছে।
নির্দেশনা জারির সময়টিও বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্য দেওয়ার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়েক দিন ধরে আন্দোলন চলছে। সোমবার বন্দর রক্ষা কমিটির অবস্থান কর্মসূচি থেকে এনসিটি ও আরও কয়েকটি টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে কয়েক শ শ্রমিক, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী অংশ নেন।
এর পরদিন মঙ্গলবারও বন্দর প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। কর্মসূচি থেকে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হলে বন্দর ও কুতুবদিয়া অ্যাংকরেজ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীরা এনসিটির প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন বাতিলের পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল ও জেনারেল কার্গো বার্থ বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ও এর ওভারফ্লো ইয়ার্ড পরিচালনায় প্রস্তাবিত কনসেশন চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীরা অবশ্য এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এদিকে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এনসিটি পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিটে জারি করা রুল খারিজ করে দেয়। তবে পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে চুক্তি সই না করার অবস্থান জানানো হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
এই পরিস্থিতিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনা নিয়ে একদিকে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন সামনে এসেছে, অন্যদিকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ প্রকাশের পরিসর নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি বন্দরের কার্যক্রম, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন তথ্য নিরাপত্তার কারণে সীমিত থাকবে এবং কোন তথ্য সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক অনুসন্ধান ও প্রকাশের আওতায় থাকবে—তার স্পষ্ট সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এনসিটি পরিচালনা নিয়ে যখন শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে প্রকাশ্য বিতর্ক চলছে, তখন নতুন নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী এর লক্ষ্য নিরাপত্তা সুরক্ষা; তবে নির্দেশনায় কোন কোন তথ্য প্রকাশে পূর্বানুমতি আবশ্যক এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে আরও স্পষ্টতা না এলে বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।