একজনের বিদায় ছিল উৎসব, আবেগ আর ভালোবাসায় ভরা। অন্যজনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা এখনও নিশ্চিত নয়, তবে এরই মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে কোচের সঙ্গে টানাপোড়েন। ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সম্ভাব্য বিদায়ের এমন দুই ভিন্ন চিত্রে খারাপ লাগছে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক গ্যারি লিনেকারের।
জাতীয় দলকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় বলেননি রোনালদো। বরং পর্তুগালের প্রধান কোচ জর্জে জেসুসের বিরুদ্ধে ‘ওয়াদা ভঙ্গের’ অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার দীর্ঘ এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি দেশের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার বার্তাও দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। তবে বয়স ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষের পথে—এমন আলোচনা জোরালো হয়েছে।
রোনালদোর এমন টানাপোড়েনের মধ্যেই আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে হয়েছে মেসির বর্ণাঢ্য বিদায়ী আয়োজন। দেশের মাঠে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো খেলতে নেমে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয়ে একটি গোল করেন মেসি, করান আরও দুটি। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাকে বিদায় জানাতে আসা সমর্থকদের অনেকের চোখেও ছিল অশ্রু।
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনেও দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবলকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। তাই তাদের সম্ভাব্য বিদায়ের দুই ভিন্ন চিত্রই নজর কেড়েছে লিনেকারের।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মনে করেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে রেকর্ড ১৪৬ গোল করা রোনালদোরও এমন একটি সম্মানজনক বিদায় প্রাপ্য ছিল।
লিনেকারের ভাষায়, রোনালদোর অসাধারণ ক্যারিয়ারের শেষদিকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া দুঃখজনক। কয়েক বছর পর কোচের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দল ছাড়ার ঘটনা হয়তো কেউ মনে রাখবে না; বরং মানুষ মনে রাখবে তিনি কতটা দুর্দান্ত খেলোয়াড় ছিলেন।
মেসির বিদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেসির বিদায়ী আয়োজনটি কত সুন্দর ছিল, সেটিই তার চোখে পড়েছে। তার মতে, রোনালদোরও একই ধরনের বিদায় প্রাপ্য।
দুই তারকার অর্জনের তালিকাতেও রয়েছে অসাধারণ সব রেকর্ড। মেসি রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, রোনালদোর দখলে পাঁচটি। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি জিতেছেন কোপা আমেরিকার দুটি শিরোপা ও বিশ্বকাপ। রোনালদোর সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, যে আসরে তার নেতৃত্বে প্রথমবার ইউরোপসেরা হয় পর্তুগাল।
রোনালদোর বর্তমান পরিস্থিতির শুরু জর্জে জেসুসের পর্তুগাল দায়িত্ব নেওয়ার পর। গত বিশ্বকাপের পর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া এই কোচ এর আগে আল নাসরে রোনালদোর সঙ্গে কাজ করেছেন। তার অধীনে গত মৌসুমে সৌদি প্রো লিগের শিরোপাও জিতেছেন রোনালদো।
জাতীয় দলে জেসুসের অধীনে শুরুটা খুব একটা খারাপ ছিল না। ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদো একাধিক সুযোগ নষ্ট করেন। পরের ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে তাকে শুরু থেকেই বেঞ্চে রাখার পরিকল্পনা ছিল। রোনালদোর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি তিনি আগেই জানতেন। তবে ম্যাচের আগের দিন কোচ তাকে জানান, দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় ৩০ মিনিট মাঠে নামতে হতে পারে।
রোনালদো পরে মাঠে নামার প্রস্তুতিও নেন। দ্বিতীয়ার্ধে তাকে ওয়ার্মআপ করতে দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর মাঠে নামানো হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ হন তিনি। কোচের সঙ্গে আলোচনার পর কিছু শর্তও দেন বলে নিজের বিবৃতিতে জানান রোনালদো।
তার অভিযোগ, জেসুস কিছু বিষয়ে তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ করেননি। এর পরই ডেনমার্ক ম্যাচের আগে পর্তুগালের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান তিনি।
সব মিলিয়ে পর্তুগাল দলে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ৪২ বছরে পা দেবেন তিনি। তবে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তারপরও লিনেকারের আক্ষেপটা অন্য জায়গায়—ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের বিদায় যদি শেষ পর্যন্ত আসে, সেটি যেন মাঠের সাফল্যের চেয়ে শেষ মুহূর্তের বিতর্কে ঢাকা না পড়ে। মেসির মতো ভালোবাসা, সম্মান আর আবেগে ভরা একটি বিদায়ই যে রোনালদোর প্রাপ্য, সেটিই মনে করিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা।