কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রস্তাব গৃহীত

এআইনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে দক্ষিণ এশিয়া, মানবাধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১০
 ছবি:

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রেখেছে। তবে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধি শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা, প্রবাসী আয় কিংবা প্রচলিত উৎপাদন খাতের ওপর নির্ভর করে টেকসই করা কঠিন হতে পারে। সেই জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও জনসেবার নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সময়ে এআইয়ের দ্রুত বিস্তারে মানবাধিকার ও ব্যক্তির মর্যাদা সুরক্ষার প্রশ্নটিও সামনে এনেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বাংলাদেশের নেতৃত্বে এআই ও মানবাধিকারবিষয়ক একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।

৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘South Asia Economic Update: Adopting AI for Growth’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা চাপের কারণে ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংক বলছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে প্রবাসী আয় এবং কয়েকটি দেশে কাঠামোগত সংস্কার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা অনিশ্চয়তা থাকলেও অঞ্চলটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিস্থাপক অবস্থানে রয়েছে।

তবে এই প্রবৃদ্ধির সামনে ঝুঁকিও কম নয়। দীর্ঘ সময় উচ্চ জ্বালানি মূল্য অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং আর্থিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর কারণে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী এআই খাতে বিনিয়োগে আকস্মিক বড় পতন হলে তা আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

এমন বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হিসেবে এআইকে দেখছে সংস্থাটি। এআই ব্যবহারে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবায় দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু এআই গ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া এখনো উন্নত অর্থনীতিগুলোর তুলনায় পিছিয়ে। প্রতিবেদনে ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। উন্নত ও জটিল এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বড়।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে অবশ্য এই পিছিয়ে থাকাকেই সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখা হয়েছে। এআই গ্রহণ দ্রুত বাড়ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুরু করেছে। বৈশ্বিক এআইনির্ভর মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার সরবরাহকারীরাও প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।

এআইয়ের সম্ভাবনা শুধু শিল্প ও ব্যবসা খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো সেবায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বিশ্বব্যাংক ভারতের কৃষকদের জন্য এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে এআই-সহায়িত রেটিনাল স্ক্রিনিংয়ের উদাহরণ দিয়েছে।

তবে প্রযুক্তি আমদানি করলেই এআইয়ের সুফল মিলবে না বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ও ভৌত অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ প্রয়োজন। কর্মীদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো দক্ষতা তৈরির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই গ্রহণের বাধা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

স্থানীয় এআই উদ্ভাবন উৎসাহিত করা এবং প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিরও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা কমার পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সহজ হবে।

এআইয়ের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এর মানবাধিকারগত প্রভাব নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনাকে এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের চলমান ৬৩তম অধিবেশনে বাংলাদেশের নেতৃত্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, মিশর, গ্রিস, গায়ানা, কুয়েত ও নেপালকে নিয়ে গঠিত কোর গ্রুপের পক্ষ থেকে ‘মানবাধিকার উন্নয়ন ও সুরক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব’ শীর্ষক প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়ার তথ্য জানায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন ২০২৬ সালের আগস্টে কোর গ্রুপের পক্ষে প্রস্তাবটি মানবাধিকার পরিষদের প্রাক-অধিবেশন সভায় প্রথম উপস্থাপন করে। এরপর বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়া হয়।

প্রস্তাবে এআইয়ের উন্নয়ন ও ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানবিক মর্যাদা ও মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

এআইয়ের সুফল যাতে কেবল উন্নত দেশ ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়টিও প্রস্তাবে গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কারিগরি সহায়তা, জ্ঞান ও বিজ্ঞান বিনিময়, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস এবং জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব—দুই দিক থেকেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও উদ্ভাবন সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মানবিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর নীতিগত কাঠামোও জরুরি।

দক্ষিণ এশিয়ার সামনে তাই এআই একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে এটি উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও জনসেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে; অন্যদিকে যথাযথ নীতি ও সুরক্ষা না থাকলে বৈষম্য, গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বাংলাদেশের উদ্যোগ—দুটি ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের এআইনির্ভর অর্থনীতিতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি মানবিক ও নীতিগত প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
 

১

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট

২

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ

৩

আমরা ভারতবিরোধী নই, আধিপত্যবিরোধী: আসিফ মাহমুদ

৪

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সারদার মতো পুলিশ একাডেমি করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৫

ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই, বিধবাকে বিয়ে করার অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে

৬

রংপুর সিটি করপোরেশনে ১,৮১২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন, আনন্দ মিছিল

৭

পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের সঙ্গে সংলাপ চায় বাংলাদেশ

৮

১৩৫ টাকার ডিজেলে শুল্ক-কর ৩৬ টাকা: রাজস্ব বাড়াতে মূল্যস্ফীতির আগুনে ঘি

৯

বিদায়বেলায় মেসিকে ‘আলিঙ্গন’ রোনালদোর

১০

বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় ঢাবির ২২ শিক্ষক-গবেষক

১১

মেসির মতো আবেগঘন বিদায় রোনালদো না পাওয়ায় খারাপ লাগছে লিনেকারের

১২

‘বিশাল গরু পার্টি’ থিমে সিডনিতে আইইউটিয়ানদের জমজমাট পুনর্মিলনী

১৩

আসিয়ান বিপর্যয়ে বাংলাদেশের অবনতি, ব্রাজিলকে টপকে পাঁচে পর্তুগাল

১৪

৩৮ রানে অলআউট সিলেট, সেঞ্চুরি তাকরিরের

১৫

যেভাবে ‘কাকতালীয় ঘটনায়’ ফাঁস হয়েছিল স্যান্ডপেপারগেট

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত