জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), মোবাইল সিমের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), এসএমএস, পাসপোর্টসহ নাগরিকের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য বিক্রির অভিযোগে পুলিশের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা ও সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে তা বাইরের চক্রের কাছে বিক্রি করতেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার চারজন হলেন তুরাগ থানার কনস্টেবল জিহাদ মিয়া, ডেমরা থানার কনস্টেবল সাইমুম হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়া এবং ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন। গত ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ও অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের ভেতরে ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের সঙ্গে আরও কারা জড়িত, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করা হতো এবং এর সঙ্গে বাইরের কোন কোন ব্যক্তি বা চক্রের যোগাযোগ রয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, আসামিরা সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতারণার মাধ্যমে সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি করতেন। আইনগতভাবে প্রাপ্ত তথ্যের অপব্যবহার করে নাগরিকের মোবাইল নম্বর, কললিস্ট, সিডিআর, মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ও এনআইডিসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যের কাছে সরবরাহের অভিযোগও আনা হয়েছে।
এজাহারে একটি ঘটনায় বলা হয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর তুরাগ থানার ওসির সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে ১১টি মোবাইল নম্বরের তিন মাসের সিডিআর চেয়ে ডিবিতে আবেদন পাঠানো হয়। আবেদনে তুরাগ থানায় গত ১৩ জুলাই করা একটি জিডির উল্লেখ ছিল। অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও ইমেইল প্রেরক হিসেবে এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম ব্যবহার করা হয়।
আবেদনের পর ডিবি গ্রামীণফোনের চারটি নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে তুরাগ থানায় পাঠায়। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবেদনে উল্লেখ করা তারিখে ওই ধরনের কোনো জিডি তুরাগ থানায় হয়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ভুয়া জিডি ও এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম ব্যবহার করে কনস্টেবল জিহাদ মিয়া সিডিআর সংগ্রহ করেন এবং পরে তা বিক্রি করেন।
অন্য একটি ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৮ মে ডেমরা থানার ওসির সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। সেখানে একটি মামলার সূত্র উল্লেখ করে তদন্ত কর্মকর্তা ও ইমেইল প্রেরক হিসেবে এসআই শাহ আলমের নাম ব্যবহার করা হয়। পরে অনুসন্ধানে ওই তারিখে ডেমরা থানায় এমন কোনো মামলা না থাকার তথ্য পাওয়া যায়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, কনস্টেবল সাইমুম হোসেন ও মাসুম মিয়া ভুয়া মামলা ও তদন্ত কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে সিডিআর সংগ্রহ করেন।
দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা, ৪০৯ ধারায় সরকারি কর্মচারীর অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং ১০৯ ধারায় অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তার বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এর সঙ্গে সরকারি গোপনীয় তথ্য সংক্রান্ত আইনেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
রমনা থানার ওসি ইয়াছিন মিয়া বলেন, ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে এ ধরনের একটি মামলা করা হয়েছে। মামলাটির তদন্তও চলছে। অভিযুক্তদের বিষয়ে তদন্ত সংস্থাই বিস্তারিত বলতে পারবে।
ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির একটি চক্রের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং কীভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হতো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো চক্র শনাক্ত করার পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচার ঘটনা অবশ্য পুলিশের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই অনুসন্ধানে এক মাসে ফেসবুকে ৬০০টির বেশি এ ধরনের বিজ্ঞাপন পাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচা চলছে। অর্থের বিনিময়ে সিডিআর, পাসপোর্টের তথ্য, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ, সিমের মালিকানা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধন ও লেনদেনের তথ্য সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল অপারেটরের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মোবাইল ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য নিতে পারে। বিভিন্ন মামলার তদন্তে সন্দেহভাজনদের কল ডিটেইল বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা বা তদন্তসংশ্লিষ্ট সদস্যদের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরের কাছে তথ্য চাওয়া হয়। তবে সেই প্রক্রিয়ায় পাওয়া নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অর্থের বিনিময়ে বাইরে পাচার করা হলে তা গোপনীয়তা ও তথ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আব্দুস সালাম সরকার, সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি ও মো. মেহেদী হাসান। তাদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করা হয়।
এসআরবি জানিয়েছিল, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নাগরিকের বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা হতো। তদন্তে ‘ই-সেবা২৪ডটটপ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়েবসাইটের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে অর্ডারের মাধ্যমে সিমের সর্বশেষ কলের লোকেশন, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ, সিডিআর, সিমের মালিকানা এবং বিকাশ-নগদ নিবন্ধন ও লেনদেনের তথ্য বিক্রির অভিযোগ ছিল।
এসআরবি-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান তখন জানিয়েছিলেন, সরকারি সার্ভার থেকে অর্থের বিনিময়ে কারা তথ্য ফাঁস করেছে, তা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা হচ্ছে না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলেও জানানো হয়।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ওই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আব্দুস সালাম সরকার ছিলেন ওয়েবসাইটটির অ্যাডমিন। অন্যরা ফেসবুক মার্কেটপ্লেস, বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে তথ্যের অর্ডার সংগ্রহ করতেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরে ১৯ কোটির বেশি গ্রাহক রয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের কল ও খুদেবার্তার তথ্য অপারেটরদের ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ পায়।
তবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা ও সরকারি তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে করা সর্বশেষ মামলার তদন্তে তাই শুধু চারজনের অপরাধ নয়, তথ্য সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া, সরকারি ইমেইলের অপব্যবহার এবং তথ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।