বিক্ষোভে বন্ধ শত শত কারখানা, উৎপাদন ব্যাহত; বকেয়া বেতন, ছাঁটাই ও শ্রমিক অধিকার নিয়েও ক্ষোভ—দ্রুত মজুরি নির্ধারণের চাপে সরকার
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলো। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে বন্ধ হয়েছে শত শত কারখানা। কোথাও যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, কোথাও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, নিয়মিত বেতন এবং রপ্তানি কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনের মুখে ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিচারপতি শেখ আসফাকুর রহমানকে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং নিরপেক্ষ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই বোর্ডের দায়িত্ব নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করা। তবে বোর্ড গঠন হলেও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি, বকেয়া বেতন পরিশোধ, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোর সমাধান এখনো বাকি।
ফলে এখন বড় প্রশ্ন, মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ কত দ্রুত কমবে। নাকি মজুরি নির্ধারণের দীর্ঘ আলোচনায় নতুন করে বাড়বে অনিশ্চয়তা?
১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানোর সংকট
দেশের তৈরি পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারিত এই মজুরি ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এরপর খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় বর্তমান আয়ে পরিবার নিয়ে শহরে বসবাস ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি বর্তমান সর্বনিম্ন মজুরির তুলনায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ দাবি অনুযায়ী মজুরি নির্ধারিত হলে সর্বনিম্ন মজুরি বর্তমানের ২ দশমিক ৪ গুণ হবে। তবে এই দাবির বিপরীতে মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ এবং পোশাকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়গুলোও আলোচনায় আসবে।
শ্রমিকদের ক্ষোভ শুধু মূল বেতন নিয়ে নয়। বকেয়া বেতন পরিশোধ, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ, চাকরির ক্ষেত্রে কালো তালিকাভুক্তির চর্চা বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে নতুন মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
অক্টোবরের শুরুতে গাজীপুরে শ্রমিক সমাবেশ থেকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি ওঠে। ১ ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে পরে দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৪ ও ১৫ অক্টোবর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ হয়। একই সময়ে মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছে প্রতিনিধি মনোনয়নের চিঠি পাঠায় শ্রম অধিদপ্তর।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ আগে নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হতো না। শ্রম আইনের সংশোধিত বিধানে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সে হিসেবে নতুন মজুরি পর্যালোচনার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আসার কথা ছিল। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে দেরি হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।
মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরে সংঘর্ষ
৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ১ নভেম্বর আরও বিস্তৃত হয়। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মিরপুর-১০ এলাকায় সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ১১টার পর শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। একপর্যায়ে মিরপুর-১১ এলাকায় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরিস্থিতির কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করে সড়কে অবস্থান নেন। পরে অন্য কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। নরসিংহপুরে অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকদের অবস্থান সরাতে গেলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিকেলে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করা হলে পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়।
গাজীপুরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টেও বিক্ষোভ হয়। কোথাও সড়কে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেওয়া হয়। যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
আন্দোলনের প্রথম দিন আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানা এবং মিরপুরের পোশাক কারখানাগুলোতে কাজ ব্যাহত হয়। পরদিনও পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকায় কারখানা বন্ধ বা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বন্ধ কারখানার হিসাব এক নয়
শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়েছে, তা নিয়ে প্রকাশিত পরিসংখ্যানেও পার্থক্য রয়েছে। বিজিএমইএর ১ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে সংগঠনটির আওতাধীন মোট ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ৩১৮টি শ্রম অসন্তোষের কারণে বন্ধ ছিল। ওই হিসাব অনুযায়ী, চালু ছিল ১ হাজার ৮১৬টি কারখানা।
এলাকাভিত্তিক হিসাবে ডিএমপি এলাকার ৩২০টি কারখানার মধ্যে মিরপুরে ৬৮টি বন্ধ ছিল। এসব কারখানা থেকে কাজ না করে বেরিয়ে আসেন ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ২২৫টি বন্ধ ছিল; সেখান থেকে কাজ না করে বেরিয়ে আসেন ৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিক। অন্যদিকে সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকার ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২৫টি বন্ধ ছিল। এসব এলাকায় কাজ না করে বেরিয়ে আসা শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ২৭০ জন বলে জানানো হয়।

অন্য একটি প্রতিবেদনে ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ার ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি বলে বিজিএমইএর সভাপতির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তবে ৩১৮টি বন্ধ কারখানা এবং ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন না হওয়ার হিসাবের সংজ্ঞা ও সময়সীমা এক কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাই দুটি সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
সংখ্যার এই পার্থক্য সত্ত্বেও পরিস্থিতির ব্যাপকতা নিয়ে সন্দেহ নেই। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবিকার ওপর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে রপ্তানিকারকদের ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশ নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মজুরি বোর্ড গঠন, এখন কী হবে
শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ৩১ অক্টোবর শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী রাজধানীর বিজয়নগরের শ্রম ভবনে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি পরদিন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে নিয়মিত বেতন দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানান তিনি।
এর ধারাবাহিকতায় ১ নভেম্বর পৃথক প্রজ্ঞাপনে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান বিচারপতি শেখ আসফাকুর রহমান। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে।
প্রজ্ঞাপনে বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করতে চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমমন্ত্রীও দ্রুত বৈঠকে বসে কাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বোর্ড গঠন মানেই মজুরি বৃদ্ধি নয়। শ্রমিকদের দাবি, মালিকদের আর্থিক যুক্তি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করে বোর্ডকে সুপারিশ দিতে হবে। এরপর আইন অনুযায়ী নতুন মজুরি নির্ধারণ ও কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ফলে বোর্ড কত দ্রুত কাজ শুরু করে এবং আলোচনার জন্য কী সময়সীমা নির্ধারণ করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমিক নেতাদের অবস্থানেও মতভেদ
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে একমত দেখা যাচ্ছে না। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার মনে করেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে দায়িত্ব পালন করেছে। এখন শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়া উচিত। তাঁর ভাষ্য, ন্যায্য পাওনা আদায়ে আন্দোলনের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমান আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিনও দ্রুত কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে আলোচনা চলছিল। এ অবস্থায় হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে সড়কে নামার যৌক্তিকতা নেই। তবে আন্দোলনের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের ইন্ধন রয়েছে—এমন অভিযোগের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট প্রমাণ দেননি বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের সহসভাপতি জলি তালুকদার মনে করেন, সরকার সময়মতো মজুরি বোর্ড গঠন না করায় শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, শ্রমিকদের আন্দোলন শুরুর আগেই কেন মজুরি বোর্ড গঠন করা হলো না? তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ, হামলা ও গ্রেপ্তারের মতো ঘটনা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করেছে। তাঁর মতে, শ্রমিকদের প্রকৃত সংকট সমাধান না করে আন্দোলনের পেছনে বহিরাগতদের ইন্ধনের কথা বললে সমস্যার সমাধান হবে না।
জলি তালুকদার মজুরি বোর্ড গঠনকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও শ্রমিকদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধ এবং আলোচনার মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, কাজে ফিরে যাওয়া এবং আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
মালিকদের উদ্বেগ, কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি
মালিকপক্ষের বক্তব্য, মজুরি বোর্ড গঠনের পর এখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে উৎপাদন সচল রাখা কঠিন হবে এবং কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন ও গেজেট প্রকাশের বিষয়ে মালিকদের জানিয়েছে। এরপরও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানা সাময়িক বন্ধ করতে পারেন মালিকেরা বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার মতো চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শিল্পের জন্য আরও ঝুঁকি তৈরি করবে।
তবে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শ্রম আইনের বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও আইনগত শর্তের ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিকদের কাজে অনুপস্থিতি, ধর্মঘটের বৈধতা এবং মালিকের সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বা অবৈধ বলা যায় না।
কলকারখানার কার্যক্রম ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
শ্রমিক অসন্তোষ বাড়তে থাকায় কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার রাতে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ নির্দেশনার কথা জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন সঠিকভাবে চলে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত থাকে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন তিনি।' তিনি আরও বলেন, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলন, মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আরিফুল হক বলেন, জননিরাপত্তা ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার উপায় নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। এ বিষয়টি এবং এসব ষড়যন্ত্রে জড়িতদের কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।' এ সময় মন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিছু মানুষ রাজনৈতিক দল ও শ্রমিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনকে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমরা রাজনৈতিকভাবে এর মোকাবিলা করব।'
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক সংসদ সদস্য শামছুরর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থনীতি ও শ্রমিক অধিকারের ভারসাম্য
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা হলে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, পণ্য সরবরাহ, রপ্তানি আয় এবং শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন পাওয়ার বিষয়ও প্রভাবিত হতে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও মজুরি দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত থাকলে তাঁদের জীবনমান ও কর্মক্ষেত্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই নতুন মজুরি বোর্ডের প্রধান চ্যালেঞ্জ। শুধু মালিকদের উৎপাদন ব্যয়ের যুক্তি কিংবা শ্রমিকদের দাবির অঙ্ক বিবেচনা করলেই চলবে না; জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন, শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা এবং রপ্তানি বাজারের বাস্তবতাও পর্যালোচনা করতে হবে।
একই সঙ্গে বকেয়া বেতন পরিশোধ, নিয়মিত বেতন দেওয়ার সময়সীমা, যথেচ্ছ ছাঁটাই বন্ধ এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগের মতো বিষয়গুলোরও বাস্তব সমাধান প্রয়োজন। মজুরি বোর্ডের আলোচনার পাশাপাশি এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে অসন্তোষ আবারও ফিরে আসতে পারে।
এখন বোর্ডের সামনে দুটি জরুরি কাজ—একদিকে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, অন্যদিকে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের আস্থা তৈরি করা। শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান তখনই কার্যকর হবে, যখন তাঁরা আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি এবং তাঁদের দাবির ন্যায্য বিবেচনার নিশ্চয়তা দেখতে পাবেন। একইভাবে উৎপাদন সচল রাখতে মালিকপক্ষকেও শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মজুরি বোর্ডের সাফল্য নির্ভর করবে কত দ্রুত বৈঠক শুরু হয়, কী সময়সীমার মধ্যে সুপারিশ দেওয়া হয় এবং নতুন মজুরি বাস্তবায়নের পথ কতটা স্পষ্ট হয় তার ওপর। বোর্ড গঠন শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করেছে; কিন্তু সেই সুযোগকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে হলে সিদ্ধান্ত, আলোচনা ও বাস্তবায়ন—তিন ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।