নব্বই দশকে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে পা রাখেন সাবরিন সাকা মীম। পরবর্তীতে অভিনয় প্রতিভা দিয়ে নাট্যাঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন। প্রায় ১৪ বছর আগে ডা. শাহরিয়ার আহমেদ সজিবের সঙ্গে ঘর বাঁধেন মীম। কিন্তু এ সংসার ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। সংসার ভাঙার ৮ বছর পর বিবাহবিচ্ছেদের আদ্যোপান্ত জানালেন তিনি।
সংগীতশিল্পী পুতুলের পডকাস্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে মীম তার ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেন। মীম খুব ঘটা করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন। তা স্মরণ করে সঞ্চালক বলেন, আপনার বিয়েটা ভীষণ শখের ছিল। আয়োজনে কোনো কিছুর কমতি ছিল না। কিন্তু সেই স্বপ্নই ভঙ্গ হলো।
বিষয়টি নিয়ে সাবরিন সাকা মীম বলেন, “একটা বয়সের পর মেয়েদের মনে হয়, বিয়ে যেহেতু করতেই হবে, তাহলে এভাবে বিয়ে করব, এরকম অনুষ্ঠান করব, এভাবে সাজব। আমার মনে হয়, যারা বিয়ে নিয়ে একবার হলেও ভেবেছেন, তাদের মনেই এমন ছোট ছোট স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে। আমিও আমার বোনকে বিয়ে নিয়ে স্বপ্নের কথা বলতাম। পরে বিয়ের সময়ে আমার আম্মুকে দিয়ে আমার বোন সব আয়োজন করিয়েছিলেন।”
ভাগ্যে বিশ্বাসী মীম। তা স্মরণ করে এই অভিনেত্রী বলেন, “আসলে মানুষের জীবন তো মানুষের হাতে লেখা না, এটা আমি বিশ্বাস করি। এই ভাগ্য নিয়ে আব্বুর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝেই ঝগড়া হতো। আমি বলতাম—মানুষের ভাগ্যই সব। যতই চেষ্টা করো না কেন, যেটা তোমার ভাগ্যে লেখা আছে, সেটাই হবে। কিন্তু আব্বু বলতেন, ‘না, ভাগ্যও আছে এবং চেষ্টাও করতে হয়।’ কিন্তু আব্বু আমাকে এটা কখনো বোঝাতে পারেননি। আমি বিশ্বাস করি, সবকিছু আমাদের হাতে নেই। আমি বিয়ে করেছি, অন্যান্য মেয়ে যেমন চিন্তা করে বিয়ে করেন, আমিও তাই করেছি। সবকিছু সুন্দর মতো চলবে, সেই চেষ্টাও ছিল। নিশ্চয়ই আমার পার্টনারেরও সেই চেষ্টা ছিল। কিন্তু যেকোনোভাবেই সংসারটা টিকল না।”
২০১২ সালের ৭ ডিসেম্বর পারিবারিক আয়োজনে ডা. শাহরিয়ার আহমেদ সজিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মীম। বিয়ের পর অভিনয় থেকে পুরোপুরি নিজেকে গুটিয়ে নেন। কারণ মীমের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া নিয়ে আপত্তি ছিল। সংসার ভাঙার পেছনে কী এটাই কারণ? এ প্রশ্নের জবাবে মীম বলেন, “আপনি হয়তো গান পছন্দ করেন, আরেকজনের গান নাই পছন্দ হতে পারে। আমি অভিনয় পছন্দ করি, একটা মানুষের অভিনয় নাও ভালো লাগতে পারে। কেউ হয়তো খুব পড়াশোনা পছন্দ করেন, আমার হয়তো পড়াশোনা পছন্দ হয় না! এরকমটা হতেই পারে! এসব কোনো বিষয় না। এছাড়াও আরো অনেক ইস্যু ছিল, দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল।”

বদলে গেছে অভিনেত্রী সাবরিন সাকা মীমের জীবন। শারীরিকভাবেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে তার। প্রথম দেখায় তার ভক্ত-অনুরাগীরা রীতিমতো দ্বিধায় পড়ে যাবেন
এক ছাদের নিচে বসবাস করেও একসঙ্গে নেই, এমন স্বামী-স্ত্রীর সংখ্যা সমাজে কম নেই। তা উল্লেখ করে মীম বলেন, “আমি কাউকে দোষ দেব না। হয়তো আমিও দোষী, হয়তো সেও (বর) দোষী, যার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল। আমরা অনেক মানিয়ে নিয়ে চলি। অনেক স্বামী-স্ত্রীকে চিনি, যারা একসঙ্গে থেকেও একসঙ্গে নেই। এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। ভালোবাসার সংসারের স্বপ্ন দেখে আমরা ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি। বোঝাপড়া, সমঝোতা—কতজনের মধ্যে আছে? কেউ সন্তানের কারণে, কেউ পরিবারের কারণে, কেউ মান-সম্মানের ভয়ে জোর করে সংসারটা টিকিয়ে রাখি। আমিও যখন বুঝতে পারলাম—না, এটা আসলে হচ্ছে না। আমি সাড়ে ৫ বছর অপেক্ষা করেছি। এটা দীর্ঘ সময়। এটা করেছি কারণ, কখনো যেন মনে না হয়—সংসারটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করিনি।”
সাবরিনা সাকা মীমের বাবা-মা পেশায় চিকিৎসক। শারীরিকভাবেও অসুস্থ। ফলে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন মীম। এ অভিনেত্রী বলেন, “আমার বাবা-মা অনেক আধুনিক। তারপরও কেউ কী চায় তার মেয়ের সংসার ভেঙে যাক! বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার আমার বাবা-মাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছি, যাতে উনারা ভেঙে না পড়েন। তারপর আমার বাসায়ই বিচ্ছেদের পেপারে স্বাক্ষর করি। ২০১৮ সালের ৭ জুন, বিচ্ছেদের পেপারে সাইন করি। সময়টা রোজার মাস ছিল।”
মীমের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে তাও ৯ বছর চলছে। পরিবার পুনরায় তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আর বিয়ে করতে রাজি নন মীম। তিনি বলেন, “নতুন করে সম্পর্কে জড়াব, বিয়ে করব সেই আস্থা আর আমার মধ্যে নেই। এটা আর আমাকে দিয়ে হবে না। বিচ্ছেদের পর ৮ বছর কেটে গেছে, এখন ৯ বছর চলছে। পরিবার থেকে বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। ডিভোর্সের পর আমার অনেক বিয়ের প্রস্তাব আনা হয়েছে। বিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে এতটা জোর দেয়া হয়েছে যে, বিয়ের আগেও এতটা জোর কখনো দেয়া হয়নি। শুধু এই কারণে এতগুলো বছর কোনো গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিইনি।”
গানের অনুষ্ঠান দিয়ে শৈশবে শোবিজ অঙ্গনে পা রাখেন মীম। এর ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে বিটিভির নাটকে অভিনয় শুরু করেন। পরিণত বয়সে নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে দেখা যায় তাকে। অভিনয় গুণে অল্প সময়ের মধ্যে নাট্য অঙ্গনে নিজের শক্ত জায়গা গড়ে নেন। টানা প্রায় ১৮ বছর মিডিয়ায় কাজ করার পর এই অঙ্গন থেকে দূরে সরে যান মীম। ২০১২ সালে সর্বশেষ তাকে নাটকে দেখা যায়। তারপর আড়ালে চলে যান। সংবাদ পাঠিকা হিসেবে কাজ করলেও অভিনয়ে আর ফেরেননি এই অভিনেত্রী।