গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চিকিৎসকসংকট, তদারকির অভাব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের উদাসীনতায় নিজেই যেন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ফলে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একসময় স্থানীয় মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল ছিল কেন্দ্রটি। তবে বর্তমানে এর অবকাঠামো ও সেবার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু বেলকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র নয়, উপজেলার আটটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাতটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৬২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে নামমাত্র চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কর্মীরাও বিভিন্ন পদ শূন্য থাকার অজুহাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না। এমনকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সময়মতো খোলা হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতি দেখে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীন দেশে এসব স্বাস্থ্যকর্মী স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ালে তাতে দোষের কী?
কেন্দ্রটির চারপাশে ঝোপঝাড়, ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা এবং ভেতরে পোকামাকড়ের বসবাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে চিকিৎসা নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই বললেই চলে। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত ভবনটি দীর্ঘদিনের অবহেলায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অথচ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে সেবা নিতে এসে প্রতিদিন অনেক মানুষ হতাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় আটটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাতটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এ ছাড়া ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ১৩৬টি পদ শূন্য রয়েছে। ১৫টি ইউনিয়নের জন্য ১৫ জন মেডিকেল অফিসার বা সহকারী সার্জনের পদ এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ১৫টি ইউনিয়নে ১৭ জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে। পাশাপাশি একটি অ্যাম্বুলেন্সচালকের পদও অনুমোদিত। তবে এসব পদে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক ও জনবলসংকটে অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ থাকায় মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উপজেলার বেলকা বাজারের মো. সুমন মিয়া বলেন, বেলকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা দেখে মনে হয়, এটি দেখাশোনা করার কেউ নেই। সপ্তাহে এক-দুই দিন খোলা হয়, তাও মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। একজন পুরুষ ও একজন নারী কর্মী রয়েছেন। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের বারান্দায় খড়ের স্তূপ, সামনে কাঁকড়াভর্তি গাড়ি, মাইক্রোবাস, ট্রলি, ভটভটি ও ডেকোরেটরের বাঁশ ফেলে রাখা হয়েছে। চারপাশে ঝোপঝাড় আর ভেতরে পোকামাকড়ের আবাস। এমন পরিবেশে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব।
বেলকা চর এলাকার আসমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিন দিন ধরে ওষুধের জন্য ঘুরছেন। এসে দেখেন, চিকিৎসক নেই। আগে সব সময় ওষুধ পাওয়া যেত। এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকলে মনে হয়, অনেক দিন ধরে এখানে কেউ আসেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্কুলশিক্ষক বলেন, বেলকা রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বড় বড় নেতা থাকলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির এই দুরবস্থা নিয়ে কেউ কথা বলেন না। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
বেলকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১১টি পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো পদেই নিয়মিত জনবল নেই বলে জানা গেছে। একজন ফার্মাসিস্ট অন্য উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এখানে সপ্তাহে দুই দিন বসেন। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা ফার্মাসিস্ট মো. ফখরুচ্ছায়াম বলেন, তাঁকে একাধিক জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে হয়। এখানে সপ্তাহে দুই দিন ওষুধ বিতরণ করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। স্থানীয়দের আন্তরিকতার অভাবেও আশপাশের পরিবেশ এমন হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, নিয়মিত অফিস খোলা না থাকলে বা তদারকি না হলে একা তাঁর পক্ষে সবকিছু সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির এমন অবস্থার পেছনে স্থানীয়দের অসচেতনতাও দায়ী। তবে চিকিৎসক ও জনবলসংকটের বিষয়টি সত্য। আশপাশের পরিবেশ ভালো রাখতে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার বিকল্প নেই।
স্থানীয়দের দাবি, নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জোরদার করা হলে বেলকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আবারও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবে—এমন প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।