বিএনপির কাউন্সিল শিগগির, মহাসচিব পদে আলোচনায় যারা

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
বাঁ থেকে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও মীর শাহে আলম ছবি:
বাঁ থেকে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল কবির রিজভী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও মীর শাহে আলম ছবি:

সরকার ও দল পরিচালনায় নতুন সমীকরণ, নেতৃত্বে পরিবর্তনের আভাস; নজর নতুন প্রজন্মের দিকেও

বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দলটির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন—এ প্রশ্নটি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে। দীর্ঘদিন সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্য এটি হতে যাচ্ছে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম জাতীয় কাউন্সিল। ফলে এবারের কাউন্সিলকে কেবল নতুন কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। বরং সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখা, সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এই কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

দলীয় সূত্র বলছে, মহাসচিব পদে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নীরব আলোচনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত সাধারণত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখার প্রবণতা রয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নাও হতে পারে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি বলেছেন, খুব দ্রুতই দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে তারা আশা করছেন। তবে কাউন্সিলের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানও জানিয়েছেন, আগামী কাউন্সিলেই মহাসচিব নির্ধারণ করা হবে। ফলে বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

কেন এবারের কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ

বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সাংগঠনিক নানা বাস্তবতায় দীর্ঘ সময় কাউন্সিল আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

এরই মধ্যে বিএনপি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। ফলে এবারের কাউন্সিল দলটির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একটি দলের প্রধান কাজ আন্দোলন পরিচালনা ও সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর দলের দায়িত্বের ধরন বদলে যায়। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় কর্মীদের সক্রিয় রাখা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখা এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের সমন্বয় করা জরুরি হয়ে পড়ে।

এ কারণে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবকে শুধু সাংগঠনিক নেতা হিসেবে নয়, একই সঙ্গে সরকার ও দলের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হবে—এমনটাই মনে করছেন দলটির নেতাদের অনেকে।

মহাসচিব পদে আলোচনায় পাঁচ নেতা

দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কয়েকজনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং বিএনপির নেতা ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

তবে দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় থাকা নামের তালিকা এখনো চূড়ান্ত নয়। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত এবং কাউন্সিলের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

রুহুল কবির রিজভী: সাংগঠনিক নেতৃত্বের শক্তিশালী মুখ

মহাসচিব পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর নাম অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় তিনি। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় দলের কর্মসূচি ঘোষণা, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগে তাকে নিয়মিত সক্রিয় দেখা গেছে।

দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা মহাসচিব পদের জন্য তাকে এগিয়ে রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে তার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নও রয়েছে—সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তিনি কতটা কার্যকরভাবে সামলাতে পারবেন। আবার দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বকে যদি সরকার থেকে আলাদা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে রিজভীর সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ: সরকার ও দলের সমন্বয়ের সমীকরণ

মহাসচিব পদের আলোচনায় থাকা আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম সালাহউদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।

দলের সরকার পরিচালনা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয়কে যদি এবারের কাউন্সিলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো অভিজ্ঞ নেতারা আলোচনায় এগিয়ে আসতে পারেন।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতা মহাসচিব পদের জন্য বিবেচনায় আসতে পারে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের মহাসচিবের মতো অত্যন্ত ব্যস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব তিনি একই সঙ্গে পালন করবেন কি না।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: নীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও মহাসচিব পদে আলোচনায় রয়েছে। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

বিএনপি সরকার পরিচালনায় অর্থনৈতিক সংস্কার, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিলে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে তার মতো নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতার ভূমিকা বাড়তে পারে।

তবে মহাসচিবের দায়িত্বের একটি বড় অংশ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সরকার ও দলের নেতৃত্বের কাঠামো কীভাবে সাজানো হবে, তার ওপর তার সম্ভাবনাও নির্ভর করবে।

হাবিব-উন-নবী খান সোহেল: নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নামও সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিএনপি যদি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার পরিকল্পনা নেয়, সে ক্ষেত্রে তার মতো নেতারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।

দলের একাংশ মনে করে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা তরুণ ও মধ্যপ্রজন্মের নেতাদের সামনে আনা হলে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি আরও বাড়তে পারে।

মীর শাহে আলম: প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও বিবেচনায়

মীর শাহে আলমের নামও দলীয় অভ্যন্তরের আলোচনায় রয়েছে। সরকারে দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা মহাসচিব পদের জন্য তার সম্ভাবনাকে আলোচনায় এনেছে।

তবে তার ক্ষেত্রে রিজভী বা সোহেলের মতো সরাসরি সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভূমিকা এবং তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিজ্ঞতা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মির্জা ফখরুলের ভবিষ্যৎ কী

বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের সপ্তম মহাসচিব নির্বাচিত হন।

দীর্ঘ সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা আসেনি।

যদি তিনি রাষ্ট্রপতি পদে যান, তাহলে বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব আসার বিষয়টি আরও জোরালো হবে। আর তিনি দলেই থাকলে মহাসচিব হিসেবে তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, সেটিও কাউন্সিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

মূলত দুটি সমীকরণে নির্ভর করছে সিদ্ধান্ত

বিএনপির মহাসচিব নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় সূত্রগুলো দুটি সম্ভাব্য সমীকরণের কথা বলছে। প্রথম সমীকরণ—সরকার ও দলের নেতৃত্বে সমন্বয়। এই কাঠামোতে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এমন কোনো অভিজ্ঞ নেতাকে দলের মহাসচিব করা হতে পারে। এর ফলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় সহজ হবে। দ্বিতীয় সমীকরণ—সরকার ও দলকে পৃথক রাখা।

এই মডেলে দলের মহাসচিবকে পুরোপুরি সাংগঠনিক কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। সরকার পরিচালনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা; আর দল পরিচালনা ও সংগঠন শক্তিশালী করার দায়িত্ব থাকবে মহাসচিবের হাতে।

দলীয় সূত্রের মতে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কোন মডেলকে বেশি কার্যকর মনে করছে, তার ওপরই সম্ভাব্য মহাসচিব নির্বাচনের বিষয়টি অনেকটা নির্ভর করতে পারে।

বদল আসতে পারে কেন্দ্রীয় কমিটিতেও

আসন্ন কাউন্সিলে শুধু মহাসচিব পদেই পরিবর্তন নয়, দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনে আনা, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করা এবং সাংগঠনিক কাঠামোকে আধুনিক করার বিষয়টিও কাউন্সিলে গুরুত্ব পেতে পারে।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় যে ধরনের পরিবর্তন এসেছে, ক্ষমতায় আসার পর তা পুনর্বিন্যাস করাও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতায় বিএনপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকার পর ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় জনপ্রিয়তা ধরে রাখা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—এসব বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে সরকারকে। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বা তৃণমূলে বিশৃঙ্খলা ঠেকানোও বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার সময় একটি দলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সাংগঠনিক আত্মতুষ্টি। দীর্ঘদিন আন্দোলনের রাজনীতিতে থাকা দল ক্ষমতায় গিয়ে যদি সংগঠনকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে, তাহলে তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তাই বিএনপির জন্য এমন একজন মহাসচিব প্রয়োজন, যিনি একই সঙ্গে দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখবেন এবং সরকারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় করবেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়

বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল এখন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দলটির সামনে এখন নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্ন। এ অবস্থায় জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কাঠামো কীভাবে সাজানো হবে, তা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল কতটা কেন্দ্রীভূত থাকবে, নাকি বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নেতৃত্বকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে—এ বিষয়টিও কাউন্সিলের পর স্পষ্ট হতে পারে।

বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে

বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ক্ষমতায় থাকার সময় দলটি কীভাবে সরকার পরিচালনা করে এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে তার ওপর। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সময় বিএনপি যে রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে, ক্ষমতায় থাকার সময়ে সেই সমর্থন ধরে রাখা সহজ হবে না। বরং এখন প্রতিটি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হবে। বিরোধী দলগুলো যেমন সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করবে, তেমনি দলের ভেতর থেকেও কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণের চাপ থাকবে। এ ক্ষেত্রে দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী রাখা এবং সরকার পরিচালনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মহাসচিব যদি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ, তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় করতে সক্ষম হন, তাহলে তিনি বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

অন্যদিকে, সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হলে অথবা ক্ষমতার রাজনীতিতে দলের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বিএনপির আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল তাই শুধু নতুন মহাসচিব নির্বাচনের কাউন্সিল নয়; বরং এটি হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্বের ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। শেষ পর্যন্ত মহাসচিব পদে কে আসছেন, তা নির্ধারণ করবে বিএনপি সরকার ও দল—দুই কাঠামোর মধ্যে কী ধরনের সমন্বয়ের মডেল বেছে নিচ্ছে।
 

এলাকার খবর

সম্পর্কিত