ত্রয়োদশ সংসদের সংরক্ষিত ৫০ আসনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৩৬টি আসন পাবে। আর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পাবে ১৩টি আসন। স্বতন্ত্র জোট একটি আসন পাবে। ১২ মে এ নির্বাচনের দিন রাখা হয়েছে, তাতে দলের টিকেট পেলে বিনাভোটেই নির্বাচিত হবেন প্রার্থীরা।
দল ও জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান প্রার্থী হলে আর ভোটের প্রয়োজন হয় না। নির্ধারিত দিনে যারা মনোনয়নপত্র জমা দেন, বাছাইয়ে বৈধ হলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের পর বিনাপ্রতিন্দ্বিতায় তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। ফলে কারা কোন দলের টিকেট পাচ্ছেন, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ সোমবার নির্বাচন কমিশন সভার সিদ্ধান্ত তুলে ধরে বলেছেন, বুধবার সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা করা হবে; তখন মনোনয়নপত্র জমার দিন, বাছাই ও প্রত্যাহারের সময় জানানো হবে। ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ মে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘটনা প্রবাহ পেরিয়ে প্রায় দেড় বছর পর গেল ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়। একই দিন একসঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটও হয়েছে।
পরদিন গেজেট প্রকাশ করে ইসি; তার ৯০ দিনের মধ্যে নারী আসনের ভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ভোটে জয়ী দলগুলোর আসন সংখ্যার অনুপাতে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়।
কো দল ও জোট কত আসন পাচ্ছে
সংসদের সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনে ভোট দিয়ে থাকেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি আসন পেয়েছে ২০৯টি। আসন সমঝোতায় দলটির মিত্র গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে।
অন্যদিকে ৬৮টি আসনে জয়ী হয়ে জামায়াতে ইসলামী বসেছে বিরোধী দলের আসনে। ভোটে তাদের জোট ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ এর শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুইটি ও খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি আসন।
এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন পেয়েছে একটি। সাতটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।
আদালতের আদেশ থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ বিলম্ব হচ্ছে। বৃহস্পতিবার শেরপুর-৩ ও বুগড়া-৬ আসনের ভোট রয়েছে।
এর চার আসনের ফল যাই হোক না কেন, তা সংরক্ষিত নারী আসন বন্টনে প্রভাব ফেলবে না, বলেছেন ইসি কর্মকর্তারা।
আসন বণ্টন (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে) অনুযায়ী, বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে একটি সংরক্ষিত আসনে পাবে বলে জানিয়েছেন ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে ইসির যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রিটার্নিং অফিসার ও উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। নির্বাচন ভবনে তফসিল অনুযায়ী তাদের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।
মঙ্গলবার ইসি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, “ইতোমধ্যে ২৯৬ জন সংসদ সদস্যের ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার তফসিল ঘোষণা করা হবে।” বরাদ্দ আসন অনুযায়ী দল বা জোট তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, বলেন তিনি।
বিএনপি জোটে কারা আলোচনায়
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা বিডিনিউজ টায়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির সংসদীয় মনোয়ন বোর্ড বা স্থায়ী কমিটির সভায় সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করবে। এর আগে মনোনয়ন ফরম ছাড়তে পারে দল।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় এমপিদের সরাসরি মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
কোনো-কোনো নেতা বলছেন, অনেক নারী নেতারা মনে করছেন সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেও সরাসরি মনোনয়ন দেবে দলের শীর্ষনেতৃত্ব।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত যাদের নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে, তারা হলেন-মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, কেন্দ্রীয় নেত্রী শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহেনা আক্তার রানু, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, সানজিদা ইসলাম তুলি ও চৌধুরী নাদিরা আক্তার।
আলোচনায় আরও রয়েছেন, কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ, দলের প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে সালিমা বেগম অরুনি, বিএনপি সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া বা সে পরিবারের কোনো সদস্য; ঢাকা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।
সংরক্ষিত আসনের আলোচনায় আরও এসেছে বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের ছাত্রদল থেকে প্রথম নির্বাচিত ভিপি ও পাবনা সাথিয়া উপজেলা বিএনপি আহবায়ক খায়রুন নাহার, বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক আসমা আজিজ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নেওয়াজ হালিমা আরলী, বিএনপি সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মুন্নী, বিএনপির সাবেক এমপি নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, গোপালগঞ্জ-১ আসনের বর্তমান এমপি সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এমপি আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহারীন খান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইনের নাম।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরও যারা রয়েছেন, তারা হলেন- কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক ভিপি অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদের সাবেক ভিপি সেলিনা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহারিন খান, সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি, সাংবাদিক কাজী জেসিন, গাজীপুর জেলা বিএনপি সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুর হান্নানের স্ত্রী ফাতেমা বিনতে দোহা, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ডালিয়া রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা মানসুরা আকতার, নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার ফারহানা চৌধুরী বেবী, লন্ডন বিএনপি সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের মেয়ে সাবরিনা খান।
বিএনপির চেয়ারম্যান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সমাজের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ‘পরিচিত’ মুখ যারা, তাদের থেকে বাছাই করা হতে পারে কয়েকজনকে।
আলোচিতদের মধ্যে দুইজনকে ফোন করা হলে তারা নিজেদের নাম উদ্ধৃত করে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
এ বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় সংসদ বিএনপি দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাই ও চূড়ান্ত করার শুরু হবে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর।”
বিএনপির জ্যেষ্ঠ একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যুগপৎ আন্দোলনে যেসব দলের ভূমিকা ছিল, সেই সমমনা দলগুলো থেকেও সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির পক্ষে মনোনয়ন দিতে পারে শীর্ষনেতৃত্ব।”
দলের চেয়ারম্যান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মিত্র দলগুলোর যাদের নাম আলোচনায় আছে, তারা হলেন সড়কে ট্রাকচাপায় নিহত বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি আরিফুল ইসলামের স্ত্রী নারী সংহতির নেতা রেবেকা নীলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শ্যামলী শীল, নির্বাচন করে পরাজিত হওয়া গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা তাসলিমা আখতার, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার এবং মেয়ে নিলম মান্না।’
তবে গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পরিষদের একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, গণসংহতি আন্দোলন বা নারী সংহতি থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ কম।
বিএনপি সরকারে গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। তার স্ত্রী তাসলিমা আখতার শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন।
জামায়াত জোটে করা আলোচনায়
নির্বাচনে ৭৭টি আসনে বিজয়ী হওয়ায় ১৩টি সংরক্ষিত আসন পাচ্ছে জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন বলছেন, জামায়াত ১১টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একটি ও এনসিপি একটি সংরক্ষিত আসন পাচ্ছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন সদস্য বলেন, বরাদ্দ সংরক্ষিত আসনে দলের মহিলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ নেত্রীরা প্রাধান্য পাচ্ছেন।
মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের একজন নেতা বলেন, “মহিলা জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতা ও জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারের কোনো কোনো সদস্য ও জামায়াতের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, এমন নারী শিক্ষককেও মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।”
এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “সংরক্ষিত আসনে এনসিপি থেকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদা মিতু ও মনিরা শারমিন মনোনয়ন পেতে পারেন।”