আট অভিযোগের তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত; কুষ্টিয়ায় ছয়জন হত্যার অভিযোগসহ পাঁচটিতে খালাস
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলের স্বাক্ষরের পর ৫০০ পৃষ্ঠার রায় প্রকাশিত হয়। বিষয়টি প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুকে আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে দোষী সাব্যস্ত করে। প্রতিটি অভিযোগে তাঁকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তিনটি সাজা একসঙ্গে চলবে বলে মোট কার্যকর সাজা ১০ বছর। দুটি অভিযোগে ১ লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ৩ নম্বর অভিযোগে রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন ও গুরুতর আহত করার ঘটনায় ইনুর দায় প্রমাণিত হয়। ২০ জুলাই ২০২৪ কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ এই ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ অভিযোগে তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৬ নম্বর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহযোগিতার দায়ে ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ অভিযোগে ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের একটি সভায় তাঁর উপস্থিতি এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেয় ট্রাইব্যুনাল।
৭ নম্বর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র ও সমঝোতায় সম্পৃক্ত থাকার দায়ে তাঁকে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ অভিযোগে ৪ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ এবং আন্দোলন দমনে নেওয়া পদক্ষেপে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আনা বাকি পাঁচ অভিযোগে ইনুকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ, ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় আন্দোলন দমনে সেনা মোতায়েন ও গুলি চালানোর সিদ্ধান্তে সমর্থনের অভিযোগ, প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, **কুষ্টিয়ায় ৫ আগস্ট ছয়জনকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগেও ইনুকে খালাস দেওয়া হয়েছে।** রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল, তাঁর ষড়যন্ত্র ও নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় এবং আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ নিহত হন। কিন্তু ৮ নম্বর অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে ওই হত্যাকাণ্ডের দায় প্রমাণিত হয়নি বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেছে।
ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ গঠন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এসব অভিযোগে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ১০ জন সাক্ষী এবং আসামিপক্ষের দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। ২০২৬ সালের মে মাসে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
রায় ঘোষণার পর ইনুর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল। এর আগে লিখিত বক্তব্যে তিনি মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন দাবি করে নিজেকে নির্দোষ বলেছিলেন।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে এখন ট্রাইব্যুনালের কোন অভিযোগে কী প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে এবং কোন অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের প্রমাণকে যথেষ্ট মনে করা হয়নি, তার বিস্তারিত কারণ জানা গেল। ফলে মামলায় ইনুর দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি অভিযোগই কার্যকর হয়েছে; কুষ্টিয়ার ছয় হত্যাকাণ্ডসহ অন্য পাঁচ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ড বহাল হয়নি।