রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বাংলাদেশের অবস্থান আবারও বিশ্বমঞ্চে সামনে এসেছে। তবে এবারের বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু প্রত্যাবাসনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়া, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে নিপীড়নের অভিযোগ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিস্তার এবং প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ওপর জমতে থাকা চাপের প্রশ্ন।
২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ, মিয়ানমারে বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহি এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা। প্রশ্ন হলো, প্রায় এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রত্যাবাসনের কথা বলা হলেও বাস্তবে কেন রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশেই? আর প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত রোডম্যাপ বাস্তবায়নের পথে মূল বাধাগুলোই বা কোথায়?
বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, সমস্যার ব্যাপ্তি কমেনি, বরং আরও জটিল হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন অবস্থান করছিলেন। অর্থাৎ ২০১৭ সালের পর যে সংকটকে সাময়িক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে। শুধু পুরোনো জনগোষ্ঠী নয়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। মিয়ানমারের সংঘাত তীব্র হওয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে নতুন মানুষের আগমন বাংলাদেশের জন্য সংকট মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এখানেই বাংলাদেশের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালানো মানবিক দায়িত্ব হলেও এসব ব্যবস্থা মূল সংকটের সমাধান নয়। রোহিঙ্গারা কেন নিজ দেশ থেকে পালিয়েছে এবং কেন তারা নিরাপদে ফিরতে পারছে না—তার উত্তর খুঁজতে হলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সংঘাতনির্ভর অবৈধ অর্থনীতি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক নিয়োগের বিষয়টিও বিশেষ উদ্বেগের। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই রোহিঙ্গাদের জোর করে নিয়োগের অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ নিরাপত্তার আশঙ্কায় নতুন করে পালিয়ে বাংলাদেশে আসছে।
এ অবস্থায় প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রশাসনিক সমঝোতা যথেষ্ট নয়। প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে হলে রোহিঙ্গাদের আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, বসতভিটা, জীবিকা এবং মৌলিক অধিকার—এসব প্রশ্নের বাস্তব সমাধান না হলে সীমান্ত পার করে মানুষ ফিরিয়ে নেওয়া গেলেও তা টেকসই প্রত্যাবাসন হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যাবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বহু বছর ধরেই বলে আসছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। সংস্থাটির অবস্থান অনুযায়ী, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয় না; রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার, নথিপত্র, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই—তিনি শুধু দ্রুত প্রত্যাবাসনের দাবি করেননি; বরং মিয়ানমারের ভেতরে এমন পরিস্থিতি তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে রোহিঙ্গারা নিজেরাই নিরাপদে ফেরার বিষয়ে আস্থা পান। এই জায়গায় তাঁর প্রস্তাবিত প্রথম ও দ্বিতীয় পদক্ষেপ পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রথমটি হলো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ তৈরি করা। দ্বিতীয়টি হলো রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাস্তবে রোডম্যাপ তৈরি করাই শেষ কথা নয়। এর বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কতটা প্রভাব প্রয়োগ সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিভিন্ন সশস্ত্র পক্ষের নিয়ন্ত্রণ এবং রাখাইনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক-সামরিক বাস্তবতা প্রত্যাবাসনকে আগের চেয়ে জটিল করেছে।
তৃতীয় প্রস্তাবটি এসেছে আরেকটি ক্রমবর্ধমান সমস্যার প্রেক্ষাপটে—মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়া। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন ধরা হয়েছিল। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ ও অংশীদাররা ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছে। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থের আবেদন প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। কিন্তু জাতিসংঘ স্পষ্ট করেছে, এই কমানো অর্থ কোনো স্বাভাবিক চাহিদার প্রতিফলন নয়; এটি মূলত ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কমানো হয়েছে।
২০২৬ সালের পরিকল্পনায় কক্সবাজার, ভাসানচর এবং আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তার আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে। খাদ্য, আশ্রয়, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও সুরক্ষার মতো খাতে অর্থ প্রয়োজন।
এখানে সংকটের আরেকটি দিক হলো আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা এলেও কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের চাপের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করছে। জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ যৌথ পরিকল্পনায় তাই রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর কল্যাণকেও অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চতুর্থ প্রস্তাব—ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি—রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কারণ ২০১৭ সালের সহিংসতার পর শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে সরিয়ে নেওয়া নয়, তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে গাম্বিয়ার করা মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সালে আইসিজে মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তিগুলো খারিজ করে মামলাটি গ্রহণের এখতিয়ার নিশ্চিত করে। এর আগে ২০২০ সালে আদালত রোহিঙ্গাদের গণহত্যা থেকে সুরক্ষার অধিকার রক্ষায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দিয়েছিল।
তবে বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রত্যাবাসন—দুটি আলাদা কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত বিষয়। বিচার হলে অতীতের অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত হতে পারে; কিন্তু রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরাতে হলে বর্তমান নিরাপত্তা ও অধিকার পরিস্থিতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে বিচার ও প্রত্যাবাসনকে পাশাপাশি রাখার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।
পঞ্চম প্রস্তাবে তিনি যে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধ অস্ত্রের কথা বলেছেন, সেটিও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। শরণার্থী শিবিরে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার শুধু মানবিক সমস্যা নয়, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও তৈরি করছে। অনিয়মিত নৌযাত্রা ও মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়েও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সতর্ক করে আসছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে শুধু ‘শরণার্থী প্রত্যাবাসন’ হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে একটি মানবিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, বিচার ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সংকট।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—প্রত্যাবাসন দ্রুত না হলে মানবিক ব্যয় বাড়বে, আর আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমতে থাকলে সেই ব্যয় সামলানো আরও কঠিন হবে। অন্যদিকে রাখাইনে নিরাপত্তা ও অধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দ্রুত প্রত্যাবাসনের চেষ্টা টেকসই নাও হতে পারে।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের পরিকল্পনাতেও তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি সুরক্ষা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা, আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের মূল বার্তা হচ্ছে—রোহিঙ্গা সংকটকে আর কেবল শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে না দেখে এর উৎস, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।
তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মিয়ানমারের ভেতরের বাস্তবতায়। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা তৈরি না হলে কোনো রোডম্যাপই কার্যকর হবে না। আবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক চাপ ও অর্থায়ন দুর্বল হলে বাংলাদেশ একাই দীর্ঘমেয়াদি এই দায়িত্ব বহন করবে—এমন বাস্তবতাও টেকসই নয়।
প্রধানমন্ত্রী তাই বলেছেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে; এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ়তার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা যত দীর্ঘ হবে, সমাধানের প্রশ্ন তত কঠিন হবে। আর সেই সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারেই।