এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ভুল ও গাফিলতির কারণে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ১ হাজার ৬৮৪ জন প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী দুই বছর তাদের এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হবে। পুনর্নিরীক্ষণের পর বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনায় এসব পরীক্ষককে শনাক্ত করা হয়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী গতকাল মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নির্ভুল ফলাফল প্রকাশের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষকদের ভুল বা গাফিলতির বিষয়টি কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকের পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
যশোর শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ আগস্ট চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পরদিন থেকে টানা সাত দিন পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় বোর্ডের ৮৮ হাজার ৯৭ জন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ হাজার ৮৬২ জন পরীক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। তাঁরা মোট ৭৪ হাজার ৭১৭টি পত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেন।
পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১ হাজার ৬৮৪ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফলে পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে মূল ফলাফলে অকৃতকার্য হওয়া ৩৮০ জন শিক্ষার্থী পুনর্নিরীক্ষণের পর পাস করেছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৩০৪ জন পরীক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে।
পুনর্নিরীক্ষণের পর নতুন করে ৭৫২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ, মূল ফল প্রকাশের সময় যেসব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি, খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর তাদের একটি বড় অংশ সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ফেল থেকে পাস করার ঘটনাও ঘটেছে ৩৮০ জনের ক্ষেত্রে।
বোর্ড সূত্রের ভাষ্য, পুনর্নিরীক্ষণের সময় পরীক্ষার্থীদের খাতায় নম্বর যোগে ভুল, কোনো প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়ন না করা কিংবা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অসঙ্গতির মতো বিষয় ধরা পড়েছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষকদের শনাক্ত করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে কোন পরীক্ষকের ক্ষেত্রে কী ধরনের ভুল পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে খাতা মূল্যায়নের সময় পরীক্ষকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন। একজন পরীক্ষকের অসতর্কতা বা মূল্যায়নে ভুলের কারণে একজন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হতে পারেন, আবার কোনো শিক্ষার্থী প্রাপ্য গ্রেড থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন।
এ কারণে খাতা মূল্যায়নে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৬৮৪ জন প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষক আগামী দুই বছর এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব পাবেন না। তবে সিদ্ধান্তটি বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী বলেন, পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে বোর্ড সর্বোচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে চায়। এ ধরনের ভুল যাতে ভবিষ্যতে কমে আসে, সে জন্য পরীক্ষকদের দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক হতে হবে। খাতা মূল্যায়নে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পুনর্নিরীক্ষণের মাধ্যমে ফল সংশোধনের সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক খাতায় ফল পরিবর্তনের ঘটনা মূল্যায়নপ্রক্রিয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে ফেল থেকে পাস এবং গ্রেড পরিবর্তনের মতো ঘটনায় খাতা মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপ আরও কঠোরভাবে তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
তবে পুনর্নিরীক্ষণে ফল পরিবর্তন হওয়া মানেই সব ক্ষেত্রে পরীক্ষকের ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। খাতা মূল্যায়নের পদ্ধতি, নম্বর যোগ, উত্তরপত্রের কোনো অংশ বাদ পড়া কিংবা পুনর্নিরীক্ষণের নিয়মের মতো বিভিন্ন বিষয়ও ফল পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। তাই কোন ধরনের ভুলের জন্য কোন পরীক্ষককে দায়ী করা হয়েছে, শৃঙ্খলা কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের এবারের পুনর্নিরীক্ষণের পর ১ হাজার ৬৮৪ জন পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনা খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর নজরদারি আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।