‘কিছু’ স্কুলে মিশ্রপদ্ধতিতে ক্লাস ‘মন্দের ভালো’, সুস্পষ্ট নির্দেশনা চান শিক্ষকরা

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

জ্বালানি সাশ্রয়ে মহানগরীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বদলে রাজধানী ঢাকার নির্বাচিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও সশরীরে উপস্থিত থেকে মিশ্রপদ্ধতিতে শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্তকে ‘মন্দের ভালো’ বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা।

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাসের বিষয়টি সামনে এলে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে আবার ব্স্তিৃত পরিসরে অনলাইনে ক্লাস চালুর আগে একজন শিক্ষাবিদ পরীক্ষামূলক পদ্ধতির ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

তবে তিন দিন অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিভাইস আসক্তি বাড়তে পারে বলে এ পদ্ধতির ক্ষতির আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন একজন শিক্ষক। দীর্ঘ ছুটির পর আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা যেসব স্কুলে হবে সেগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস কীভাবে হবে সেটি স্পষ্ট করার কথা বলেছেন একজন শিক্ষক। রোজা ও ঈদসহ বেশ কয়েকটি উপলক্ষে প্রায় দীর্ঘ ছুটির পর গত ২৯ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরির আশঙ্কা থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে সরকার। এর অংশ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে যাওয়ার বদলে অনলাইনে ক্লাস শুরুর চিন্তাভাবনা করে সরকার।

‍বৃহস্পতিবার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সেই ভাবনার বিষয়টি বাস্তবায়নের কথা বলেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে ‘কিছু’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিশ্রপদ্ধতিতে ক্লাস চালানোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি তুলে ধরেন।

তবে পরীক্ষামূলকভাবে কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিশ্র পদ্ধতি চালু হচ্ছে, তা সুনির্দিষ্ট করেননি তিনি। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানোর কথা বলেন মন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইন ক্লাসে হবে। আর শনি, সোম ও বুধবার শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসে সরাসরি শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেবে। তিনি বলেন, “এটি সবার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। যারা সক্ষমতা রাখে, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আমরা এই 'ব্লেন্ডেড এডুকেশন' বা সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করছি।"

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাসে যুক্ত হলেও শিক্ষকদের স্কুলেই উপস্থিত থেকে অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করতে হবে। শিক্ষকরা বাসায় বসে ক্লাস নেবেন না।"

দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বিবেচনায় এনে শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘অভিযোজিত করা জরুরি’ মন্তব্য করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ উদ্যোগ সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


‘পরীক্ষামূলকের ফল দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে’
নির্বাচিত কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে ক্লাস চালুর এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার কথা বলেছেন শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ।

বৃহস্পতিবার বিকালে তিনি বলেন, “আমি মনে করি এটা ভালো সুবিবেচনা। কারণ সকলকে ওরকম অনলাইনে নিয়ে নিলেতো সেটা ভালো ফল পাওয়া যাবে না, সেটা তো বলা হচ্ছিল। তারা সেটা বিবেচনায় নিয়েছেন এবং পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করতে যাচ্ছেন। এখন দেখবেন কেমন হয়। তারপরে পরবর্তী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেটাই ভালো। তো দেখা যাক কী হয়, কীভাবে তারা এটা কার্যকর করেন।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো নীতি নেওয়ার আগে বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন। দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সারাদেশের এমনকি মহানগরীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনলাইন-অফলাইনে ব্লেন্ডেড শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক আজম বলেন, “এটা হয়তো ঢাকা শহর বা রাজশাহীতে থাকে তাদের ক্ষেত্রে ঠিক আছে। কিন্তু তারাতো গোটা দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে না। আমাদের সরকারকে সে সিদ্ধান্তটা নিতে হবে যেটা গোটা জাতিকে রিপ্রেজেন্ট করবে। গোটা জাতির জন্য যেটা ইকুয়ালিটি দেবে। এখানে শহরের ছেলেমেয়েরা ভালো স্কুল কলেজে পড়ে। এরা কিন্তু স্কুলে না যেয়েও নানা মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ পায়। কিন্তু মূল ফোকাসটা হতে হবে গ্রামের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী।”

সুস্পষ্ট নির্দেশনা চান শিক্ষকরা 
মিশ্রপদ্ধতির ক্ষেত্রে অনলাইনে কীভাবে ক্লাস হবে সে বিষয়টি স্পষ্ট করার কথা বলেছেন রাজধানীর মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শাহীনা কবির। তিনি বলেন, “এটা না হলে সক্ষমতা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান মিশ্রপদ্ধতি বা অনলাইনে ক্লাস নিতে উৎসাহ দেখাবে না।” তিনি বলেন, “রোজায় বড় ছুটিটা হয়ে গেল। সামনে এসএসসি পরীক্ষায় কেন্দ্রপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকবে। তাই অনলাইন ক্লাস কীভাবে হবে সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি।”

বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি ও কেরানিগঞ্জের ২১ নং চারিগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহিনুর আলআমিন মনে করছেন কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে শ্রেণিকার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা থাকলেও সেগুলো নানা কারণে আগ্রহ নাও দেখাতে পারে। এরমধ্যে একটি কারণ হলো- মিশ্র পদ্ধতিতে ক্লাশ হলে ছয় দিন শিক্ষকদের স্কুলে আসতে হবে। আর যারা অফলাইনে ক্লাস নেবেন তারা যদি আগের নিয়মে পাঁচ দিন ক্লাস নেন সেক্ষেত্রে অনেক শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নিতে চাইবেন না। এটা পুরো উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করতে পারে।”


শিক্ষকদের সক্ষমতা যাচাইয়ের পরামর্শ
যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে সেগুলোর সব শিক্ষকের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না সে বিষয়টিও যাচাই করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী। তিনি বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে যে সিদ্ধান্তগুলো এল আমি মনে করি এটা ঠিক আছে।” মহানগরী বা রাজধানীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে ক্লাস নেওয়া বাধ্যতামূলক না করার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে যেসব শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করবে তাদের ডিভাইস আসক্তি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী। স্কুল পড়ুয়া দুই সন্তানের এই বাবা বলেন, “ক্ষতির কারণে ডিভাইস দিতে চাই না। কিন্তু অনলাইনে ক্লাসের দোহাই দিয়ে বাচ্চারা অভিভাবকদের বাধ্য করতে পারে। এতে ডিভাইস আসক্তি বাড়বে।”

আগের দিন শিক্ষামন্ত্রীও বলেছিলেন, “শিক্ষার্থীরা যাতে অনলাইনে মনোযোগী থাকে, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।”

সূত্র : বিডিনিউজ

এলাকার খবর

সম্পর্কিত