বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় অধ্যাপক স্যান্ডের বর্ণিত ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজের স্পষ্ট লক্ষণ দৃশ্যমান। এখানে ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটলে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাইতে দেখা যায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী-পুরুষের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হয়? সমাজভেদে নারী-পুরুষের এই ভূমিকা কেন আলাদা? সমাজে ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধ কেন সংঘটিত হয়? এমন সব অনিষ্পন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক পেগি রিভস স্যান্ডে এক যুগান্তকারী সমীক্ষা করেন। তিনি ১৫০টি নৃগোষ্ঠী সমাজের ওপর এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তার এই গবেষণাটি ১৯৮১ সালে ‘ফিমেল পাওয়ার অ্যান্ড মেল ডমিন্যান্স’ (নারীশক্তি ও পুরুষ আধিপত্য) শিরোনামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক স্যান্ডে গবেষণাধীন সমাজগুলোকে ‘ধর্ষণমুক্ত’ এবং ‘ধর্ষণপ্রবণ’—এই দুই ভাগে ভাগ করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে ওই ১৫০টি নৃগোষ্ঠী সমাজের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ছিল ‘ধর্ষণমুক্ত’ এবং ১৮ শতাংশ ‘ধর্ষণপ্রবণ’।
ওই গবেষণায় তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, ‘ধর্ষণমুক্ত’ সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সমাজে যৌন আগ্রাসন সামাজিকভাবে নিন্দিত একটি অপরাধ এবং ওই সমাজে ওই রকম কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দায়ী ব্যক্তিকে কঠোরভাবে দণ্ডিত করা হয়। আবার তিনি ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজে দেখতে পান যে, সেখানে ধর্ষণকে পুরুষের পৌরুষের প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও এই ধরনের সমাজে ধর্ষণকে নারীদের দমন ও ভয় প্রদর্শনের একটি কৌশল হিসেবে সামাজিক অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনি সমাজে প্রচলিত নারীদের সর্বজনীন অধীনতার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রমাণ করেন যে, এটি আসলে সামাজিকভাবে তৈরি একটি বাস্তবতা; কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষেরাই সমাজের নিয়মকানুন নিয়ন্ত্রণ করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করলে, এখানে একটি ‘ধর্ষণপ্রবণ’ সমাজের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়। অধ্যাপক স্যান্ডে তার গবেষণায় যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলেছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে তা হুবহু মিলে যায়। যেমন, এখানে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে অনেকে অপরাধের পক্ষে সাফাই গায়। সম্প্রতি নারী হেনস্তাকারীকে ফুলের মালা দিয়ে বীরের বেশে বরণ করার নজিরও দেখা গেছে। এছাড়া, নারী বা শিশু নির্যাতনের শিকার হলে সমাজ সেটাকে স্বাভাবিক বা সাধারণ ঘটনা হিসেবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। জনপরিসরে নারীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া বা ভয় দেখিয়ে লাঞ্ছিত করাটা এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি, ১১ বছরের এক শিশুর ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা ফেইসবুকে প্রকাশ করায়, সংশ্লিষ্ট নারী চিকিৎসককে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে শিশু ধর্ষণকারীর পক্ষেও জনমত গড়ার চেষ্টা চোখে পড়ে।
শুধু এই নারী চিকিৎসকই নন, জনপরিসরে নারীর চলাচল ও অধিকার বাধাগ্রস্ত করতে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও বয়ানভিত্তিক সহিংসতা চলছে। গত বছরের শুরুতে জয়পুরহাট ও রংপুরে নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী ‘ওড়না পরা’ নিয়ে এক ছাত্রীকে হেনস্তা করায় গ্রেপ্তার হন; কিন্তু জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তাকে ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়! এ বছরও রাজধানীতে ওড়না নিয়ে এক নারী সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হন। বছিলা এলাকায় পোশাক নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদ করায় এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। প্রতিদিন এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে, যার অল্প কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে আসে, আর বাকিটা অগোচরেই থেকে যায়। এই ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ‘ধর্ষণপ্রবণ’ হয়ে উঠছে।
বিখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দো সমাজে বিদ্যমান এই ধরনের পরোক্ষ বা অশরীরী দমন প্রক্রিয়াকে ‘প্রতীকী সহিংসতা’ (সিম্বলিক ভায়োলেন্স) বলে তত্ত্বায়ন করেছেন। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলোর কথায় ও আচরণে এই প্রতীকী সহিংসতা স্পষ্ট। প্রতিনিয়ত নারীকে হেয় করা, পরিবারের ওপর নির্ভরশীল বা ‘পরজীবী’ হিসেবে দেখানো এবং মর্যাদাহানি করার মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক সামাজিক কাঠামো তৈরি করা হয়। এই ধরনের বয়ান সরাসরি শারীরিক ক্ষতি না করলেও মানসিকভাবে নারীকে আরও অরক্ষিত করে তোলে এবং লিঙ্গভিত্তিক বিচারহীনতাকে উৎসাহিত করে।
জাতিসংঘের ‘পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন’ বুর্দোর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই লিঙ্গভিত্তিক প্রতীকী সহিংসতার সংজ্ঞা দিয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য তৈরি করা এবং ওই বৈষম্যের মাধ্যমে সামাজিক আচরণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই হলো প্রতীকী সহিংসতার অন্যতম উদাহরণ।” আমাদের জনপরিসরে বিরাজমান বয়ান, কাঠামো ও নারীর প্রতি সামাজিক আচরণ বিশ্লেষণ করলে এই সংজ্ঞার বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়।
এছাড়া, বাংলাদেশে নারীর ওপর সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ধর্ষণ-মিথের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। বুর্দোর তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ধারণার অর্থ হলো; ধর্ষণের ঘটনায় উল্টো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা, নির্যাতিতার চরিত্র নিয়ে বানোয়াট কথা ছড়ানো এবং ঘটনার পর সমাজের সামগ্রিক নীরবতা। যেমন, কোনো নারী নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পছন্দসই পোশাক না পরা অবস্থায় হেনস্তার শিকার হলে, তার পোশাককেই অপরাধের মূল কারণ হিসেবে প্রচার করা হয়। কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলেই সামাজিক মাধ্যমে সবার আগে তার দিকেই আঙুল তোলা হয়, এটিই হলো ‘ধর্ষণ-মিথ’।
এর পাশাপাশি সামাজিক নৈরাজ্যও লিঙ্গভিত্তিক অপরাধকে আরও উসকে দিচ্ছে। ধর্ষণের এই ঊর্ধ্বমুখী হারকে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের ‘অ্যানোমি’ (নৈরাজ্য) বা সামাজিক ভাঙন তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। পরবর্তীতে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন এই তত্ত্বের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। দুর্খেইম মনে করতেন, সমাজে যখন দ্রুত কোনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে, তখন মানুষ তার সঙ্গে সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে সমাজ মূল্যবোধহীন বা নৈরাজ্যকর হয়ে পড়ে, যা মানুষের মধ্যে আত্মঘাতী ও অপরাধপ্রবণ তাড়না তৈরি করে।
সমাজবিজ্ঞানী দুর্খেইম মনে করেন, সমাজে এই ধরনের আত্মঘাতীমূলক কর্মকাণ্ড তখনই পরিলক্ষিত হয়, যখন সামাজিক সংকটের কারণে সমাজ মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। মানুষের চাহিদা যেহেতু কেবল তার শরীর ও শরীরবৃত্তীয় চাহিদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সেহেতু তা সীমাহীন। সমাজ মূলত মানুষের এই অপরিতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কাজ করে।
১৯৩০-এর দশকে মার্টনের ‘সামাজিক চাপ তত্ত্ব’ (Social Strain Theory) এবং ১৯৪০-এর দশকে ক্লিফোর্ড আর. শ’ ও হেনরি ডি. ম্যাকের ‘সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব’ (Social Disorganization Theory) মূলত দুর্খেইমের এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। এই তত্ত্বগুলো দেখায় কীভাবে সামাজিক নৈরাজ্যের কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
তবে সমাজবিজ্ঞানী মার্টন দেখিয়েছেন যে, সমাজ অনেক সময় উল্টো কাজও করে। সমাজ নিজেই মানুষের ওপর নির্দিষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক লক্ষ্য বা আকাঙ্ক্ষার চাপ সৃষ্টি করে, যা মানুষকে অপরাধে জড়াতে প্ররোচিত করে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ পাঁচ ধরনের পথ বেছে নেয়:
· প্রথমত, অনুগামিতা (কনফর্মিটি) পদ্ধতি: এই ক্ষেত্রে মানুষ সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য অর্জনের পথ দুটোকে সামঞ্জস্য করে আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তির পথে অগ্রসর হয়।
· দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবন (ইনোভেশন): এই ক্ষেত্রে মানুষ তার সামাজিক লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেয় এবং সামাজিক বৈধ পথকে উপেক্ষা করে নিজের উদ্ভাবিত পথে লক্ষ্য অর্জনে নিয়োজিত হয়।
· তৃতীয়ত, আচারনিষ্ঠতা (রিচ্যুয়ালিজম): এই পদ্ধতিতে মানুষ সামাজিক লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে সামাজিক বৈধ পথকে অনুসরণ করে সামাজিক লক্ষ্য অর্জন করতে সচেষ্ট হয়।
· চতুর্থত, প্রত্যাহারবাদ (রিট্রিটিজম): এই পদ্ধতিতে মানুষ সামাজিক আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বৈধ পথ উভয় ক্ষেত্রে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
· পঞ্চমত, বিদ্রোহ: সর্বশেষ মানুষ বিদ্রোহ করে। অর্থাৎ পুরোনো সমস্ত কিছু বর্জন করে নতুনকে গ্রহণ করে।
শেষের তিন পদ্ধতি মানুষ তখন অবলম্বন করে, যখন প্রচলিত সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সামাজিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়।
একইভাবে শ’ ও ম্যাক তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, সামাজিক ব্যবস্থা যখন সমাজের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। একইভাবে, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র যেহেতু লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে, তাই বলা যায় আমাদের দেশের এই ধর্ষণ সংস্কৃতির মূল কারণ হলো সামাজিক নৈরাজ্য বা ‘অ্যানোমিক’ পরিস্থিতি। আর এই পরিস্থিতির পেছনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে ‘প্রতীকী সহিংসতা’ এবং ‘ধর্ষণ-মিথ’। সবশেষে, ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে এই প্রতীকী সহিংসতার পক্ষে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন।