দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বিদ্যালয়

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তবর্তী জনপদ শুভধন পাড়া। চারদিকে পাহাড় আর সবুজ অরণ্য। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানকার মানুষের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছানোই যেখানে কঠিন, সেখানে শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে নৌপথে প্রায় দুই ঘণ্টা পাড়ি দেওয়ার পর আরও প্রায় দেড় ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে যেতে হয় এই এলাকায়।

তবে দুর্গমতার সেই বাস্তবতাকে জয় করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের স্কুল। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন আশপাশের পাঁচটি পাড়ার শিশুদের জন্য শিক্ষার অন্যতম আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এলাকার বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের ভর্তি করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।


বিদ্যালয় ছিল না, ছিল শিক্ষাবঞ্চনার দীর্ঘ বাস্তবতা,
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চলে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দূরের বিদ্যালয়ে যাওয়া, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে বহু শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো।

বিশেষ করে দুর্গম এলাকার মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল আরও বেশি। অনেক পরিবার দূরের বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠাতে আগ্রহী ছিল না। দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুকে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে হতো। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ থেকেও তারা দূরে সরে যেত।

এই বাস্তবতায় পাঁচটি পাড়ার মধ্যবর্তী স্থানে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী—তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার শিশুরা এখানে এসে পড়াশোনা করছে।


৬০ শিক্ষার্থী, অপেক্ষায় আরও শতাধিক,
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে। তবে আশপাশের পাড়াগুলোতে এখনো অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এসব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি মেয়েশিশুদের শিক্ষার প্রতি পরিবারগুলোর আগ্রহ বাড়াতেও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


শিক্ষাই হতে পারে পাহাড়ি জনপদের পরিবর্তনের চাবিকাঠি,
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান শিক্ষক ও প্রধান উদ্যোক্তা ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা) বলেন, “বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু আশপাশের পাড়াগুলোতে এখনো অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। অভিভাবকদের সচেতন করে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক হবে।”

তিনি বলেন, “বিশেষ করে মেয়েশিশুদের পড়াশোনার প্রতি অনেক পরিবার এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। তাদের শিক্ষার আওতায় আনা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। এই এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে দুর্গমতা, দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”

বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু আরও বলেন, “শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, অভিভাবকদের সচেতন করা, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষার মান ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের কল্যাণ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা প্রয়োজন।”


অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি,,
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চন্দ্রজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “দুর্গম এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সহজ নয়। দীর্ঘ পথ, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও বিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। আগে এখানে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না। এখন অন্তত এই এলাকার শিশুরা নিজেদের কাছাকাছি একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। আমরা চাই, দুর্গমতার কারণে আমাদের কোনো শিশু যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে বিদ্যালয়টি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।”


দুর্গম জনপদে বদলের স্বপ্ন,,
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; দীর্ঘদিন শিক্ষাবঞ্চিত একটি পাহাড়ি জনপদের সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিয়েছে। একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া নয়, বরং তার সামনে ভবিষ্যতের নতুন পথ তৈরি করা।

দুর্গম পাহাড়ের এই জনপদে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে বিদ্যালয়টির উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে বিদ্যালয়টি আরও বড় পরিসরে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

তাদের প্রত্যাশা—পাহাড় যতই দুর্গম হোক, কোনো শিশুর স্বপ্ন যেন দুর্গমতার কাছে হার না মানে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে এই জনপদের শিশুরাই একদিন নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজের পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে।

 

শু/আজা

এলাকার খবর

সম্পর্কিত