দাঁড়িপাল্লার এক পাশে ‘৭১’, অন্য পাশে ‘২৪’; নিচে ঝুঁকে থাকা ‘২৪’-এর পাল্লা। শিল্পীর দাবি—এটি তুলনা নয়, বরং একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশের ‘অসম তুলনা’কে তুলে ধরা। অনেকের মন্তব্য, এটা জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক দাড়িপাল্লা, তাদের চোখে চব্বিশ এগিয়ে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, এমন উপস্থাপনা কি অনিচ্ছাকৃতভাবেই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাকে মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত একটি শিল্প প্রদর্শনীতে রাখা একটি শিল্পকর্মকে ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শিল্পকর্মটিতে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর দাঁড়িপাল্লা দেখা যায়। পাল্লার এক পাশে লাল রঙে লেখা ‘৭১’, অন্য পাশে কালচে রঙে ‘২৪’। দৃশ্যত ‘২৪’ লেখা পাল্লাটি নিচের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। ফলে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, শিল্পী যেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বেশি ‘ওজন’ দিয়েছেন।
এই দৃশ্যমান বার্তাই প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাদের কেউ বলছেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতার ঘটনা; একটিকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। অন্যদিকে শিল্পীর দাবি, তার কাজের উদ্দেশ্য ১৯৭১ ও ২০২৪-এর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ নয়; বরং একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশকে তুলনা করার প্রবণতাকেই প্রশ্ন করা।
ফলে একটি শিল্পকর্ম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন কেবল শিল্পের নান্দনিকতা বা প্রতীকের ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের ব্যাখ্যার প্রশ্নও।
দাঁড়িপাল্লায় ‘৭১’ ও ‘২৪’
রোববার সকাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রং তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ শীর্ষক প্রদর্শনী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে চারুকলা অনুষদের আয়োজিত আর্ট ক্যাম্পে তৈরি বিভিন্ন মাধ্যমের ৮০টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে এতে। প্রদর্শনীর মধ্যেই একটি শিল্পকর্ম দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে নজরে আসে। মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর দাঁড়িপাল্লা—এক পাশে ‘৭১’, অন্য পাশে ‘২৪’। দৃশ্যমান বিন্যাসে ‘২৪’-এর পাল্লা নিচে থাকায় তৈরি হয় ওজনের পার্থক্যের প্রতীকী বার্তা।
এই উপস্থাপনাকে ঘিরেই সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থ খুঁজতে শুরু করেন অনেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল মনে করেন, ১৯৭১ ও ২০২৪-কে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রবণতা বিভাজন তৈরি করতে পারে। তার ভাষায়, “একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রবণতা জনগণের ঐক্য নষ্ট করে। এতে কেবল পরাজিত শক্তিগুলোরই লাভ হয়।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, ১৯৭১ বাংলাদেশের মূল ইতিহাসের অংশ; ২০২৪ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলেও নতুন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ১৯৭১-কে খাটো করার প্রয়োজন নেই।
ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানও দুই ঘটনাকে একই মাপকাঠিতে বিচার করার বিপক্ষে। তার মতে, ১৯৭১ ও ২০২৪ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা এবং দুটির প্রেরণাকে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।
শিল্পীর ব্যাখ্যা
যে শিল্পকর্মটি নিয়ে এত আলোচনা, তার শিল্পী বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে শিল্পী বলেন, তার কাজের উদ্দেশ্য ১৯৭১ ও ২০২৪-এর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা নয়। বরং জুলাইয়ের পর একটি গোষ্ঠী যেভাবে ২০২৪-কে ১৯৭১-এর বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, শিল্পকর্মটির মাধ্যমে তিনি সেই প্রবণতাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে দাবি তার।
অর্থাৎ শিল্পীর বক্তব্য অনুযায়ী, দাঁড়িপাল্লায় ‘২৪’-এর পাল্লা নিচে থাকার অর্থ ‘চব্বিশের ওজন বেশি’—এমন সরল অর্থে ছবিটিকে দেখা ঠিক হবে না। এটি বরং একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশের যে অসম তুলনা করা হচ্ছে, তার একটি অলংকারিক উপস্থাপন।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে—একটি শিল্পকর্মের প্রতীকী অর্থ শিল্পী যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন, দর্শকের কাছে সেটি কি একইভাবে পৌঁছাচ্ছে?
শিল্পীর অভিপ্রায় বনাম দর্শকের পাঠ
শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শিল্পী একটি প্রতীক নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করলেও দর্শক সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। বিশেষ করে যখন কোনো প্রতীকের সঙ্গে জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকে, তখন তার পাঠ আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ‘৭১’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর ‘২৪’ বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কাল। ফলে দাঁড়িপাল্লায় এই দুটি সংখ্যাকে পাশাপাশি বসানো স্বাভাবিকভাবেই তুলনা, ধারাবাহিকতা কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
এ কারণেই শিক্ষার্থীদের একাংশের আপত্তি শুধু ছবিটির নান্দনিক বিন্যাস নিয়ে নয়; বরং প্রতীকটি জনপরিসরে কী ধরনের রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বার্তা তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও। অন্যদিকে শিল্পীর ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ছবিটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পড়া যায়—সেখানে ‘২৪’ বড় নয়; বরং ‘৭১’-এর সঙ্গে ‘২৪’-কে তুলনা করার প্রবণতাটিই প্রশ্নের মুখে। এই দুই ব্যাখ্যার মাঝখানেই তৈরি হয়েছে বিতর্কের জায়গাটি।
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
শিল্পকর্মটির বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি সামনে এসেছে প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও। চারুকলা অনুষদের ডিন মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি ওই দিন ক্যাম্পাসে ছিলেন না এবং শিল্পকর্মটি সম্পর্কে তখন পর্যন্ত অবগত ছিলেন না। ছবিগুলো কীভাবে নির্বাচিত হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, নিবন্ধনের মাধ্যমে শিল্পকর্মগুলো নির্বাচন করা হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বে ছিলেন মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম। অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, ডিনের অনুপস্থিতিতে তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার দাবি, শিল্পকর্মগুলো যাচাই-বাছাই করার সুযোগ তিনি পাননি; একটি চিঠিতে শুধু স্বাক্ষর করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ প্রশাসক অধ্যাপক কামরুজ্জামানও জানান, প্রদর্শনী আয়োজনের ক্ষেত্রে জনসংযোগ প্রশাসনের ভূমিকা সীমিত ছিল। তাদের দায়িত্ব ছিল মূলত সিনেট ভবনে প্রদর্শনীর জায়গা নির্ধারণ করা। ছবিটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না।
এখানেই উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে ইতিহাস ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীতে শিল্পকর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো কিউরেটরিয়াল বা সম্পাদকীয় যাচাই ছিল কি না।
ইতিহাস কি প্রতিযোগিতার বিষয়?
১৯৭১ বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আলোচিত। দুটি ঘটনার সময়কাল, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক ভূমিকা এক নয়। তাই তাদের সরাসরি তুলনা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—এটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে।
কিন্তু এই বিতর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে। একটি জাতির ইতিহাস কখনো স্থির নয়; নতুন ঘটনা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, স্মৃতি ও রাজনৈতিক পাঠও বদলায়। সেই পরিবর্তনকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আরেকটি ঘটনাকে অস্বীকার, খাটো বা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
রাবির প্রদর্শনীতে বিতর্কিত শিল্পকর্মটি শেষ পর্যন্ত ঠিক কোন বার্তা দিচ্ছে—সেটি নির্ভর করছে দর্শকের পাঠ ও শিল্পীর অভিপ্রায়ের মধ্যে কোন ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে তার ওপর।

প্রদর্শনী ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: রং তুলিতে মুক্ত স্বদেশ’ প্রদর্শনীতে মোট ৮০টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী চলার কথা রয়েছে। কিন্তু একটি শিল্পকর্ম ইতোমধ্যে প্রদর্শনীর আলোচনাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। এটি শুধু ‘৭১’ ও ‘২৪’-এর প্রতীকী উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে জাতীয় ইতিহাস, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা এবং শিল্পের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করবে—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
শিল্পীর স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিল্পকর্মের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলার অধিকার দর্শকের রয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানে এই দুই পক্ষের বিতর্কই শেষ পর্যন্ত আরও গভীর আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ ইতিহাসকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো কোনো একটি ঘটনাকে ‘বড়’ বা ‘ছোট’ করা নয়; বরং কোন ঘটনা কোন প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী এবং পরবর্তী প্রজন্ম সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে—সেই প্রশ্নগুলো খোলা রাখা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিল্পকর্ম সেই বিতর্কটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।