স্বরূপ নগরে খোলা মাঠ থেকে পচন ধরা মরদেহ উদ্ধার; এক প্রাপ্তবয়স্কসহ তিন কিশোর পুলিশের হেফাজতে
ভারতের দিল্লিতে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর ছুরিকাঘাতে হত্যা করে খোলা মাঠে ফেলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে ওই মাঠে কিশোরীর পচন ধরা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা মরদেহের কাছে কুকুরকে ঘোরাফেরা করতে দেখে পুলিশে খবর দেন। এ ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার এবং ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী তিন কিশোরকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। বৃহস্পতিবার পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর উত্তর দিল্লির স্বরূপ নগরের কুশাক রোডসংলগ্ন একটি খোলা মাঠ থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি এতটাই পচে ও বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে ঘটনাস্থলে প্রথমে তার লিঙ্গও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। শরীরের একটি হাত বিচ্ছিন্ন ছিল এবং মরদেহের কিছু অংশ কুকুরে খেয়ে ফেলেছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশও পচন ও আঘাতে বিকৃত হয়ে যায়। পরে ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়। শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্নও ছিল। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, ধর্ষণের পর কিশোরীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় এবং এরপর তাঁর মরদেহ মাঠে ফেলে দেওয়া হয়। তবে ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা ও প্রত্যেক অভিযুক্তের পৃথক ভূমিকা এখনো তদন্তাধীন।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, নিহত কিশোরী ও অভিযুক্তদের মধ্যে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কিশোরী এক ১৭ বছর বয়সী পরিচিতের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। পরে ওই কিশোর আরও তিনজনকে সেখানে ডাকে। তাঁরা একটি টেম্পোতে একসঙ্গে ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, টেম্পোর ভেতরে তারা মদ্যপান করেছিল। এরপর কিশোরীকে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের ভাষ্য, কিশোরী ঘটনাটি জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলে তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাঁকে স্বরূপ নগরের একটি মাঠে নিয়ে গিয়ে মরদেহটি পাতাপাতা ও মাটি দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। এরপর অভিযুক্তরা টেম্পো নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
তবে পুলিশ এখনো তদন্ত করে দেখছে, যৌন নির্যাতন ও হত্যার কোন অংশ টেম্পোর ভেতরে এবং কোন অংশ মাঠে ঘটেছিল। পাশাপাশি প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। শুরুতে অভিযুক্তদের পরিচয়ও পুলিশের কাছে ছিল না। এ অবস্থায় তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল এবং আশপাশের সড়কের ৫০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করেন। ফুটেজে সম্ভাব্য ঘটনার সময়ের কাছাকাছি একটি টেম্পোকে ওই এলাকার আশপাশ দিয়ে যেতে দেখা যায়।
তবে অন্ধকারের কারণে প্রথম দিকে টেম্পোটির নিবন্ধন নম্বর স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এরপর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে গাড়িটির গতিপথ অনুসরণ করেন তদন্তকারীরা। স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এভাবে টেম্পোটির পরিচয় শনাক্ত করার পর পুলিশ এর চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
পুলিশের ভাষ্য, চালকের দেওয়া তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে অভিযান চালানো হয়। স্বরূপ নগরের খাড্ডা কলোনি এলাকায় টেম্পোটির সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর তদন্তকারীরা চারজনের কাছে পৌঁছান। তাঁদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী শিবম গণেশ ওরফে সুদামা ওরফে চুচুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের বয়স ১৬ ও ১৭ বছর।
অভিযুক্তদের কাছ থেকে দুটি ছুরি, ঘটনার সময় পরা বলে দাবি করা পোশাক এবং সংশ্লিষ্ট টেম্পো জব্দ করা হয়েছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, উদ্ধার হওয়া আলামত ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহত কিশোরীকে নিয়ে পুলিশের তদন্তে আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিলেন এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তার জন্য কাজ খুঁজছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি স্বরূপ নগর এলাকায় চলে এসেছিলেন এবং আলাদাভাবে থাকতেন।
পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়নি। পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে বলেছেন, তিনি মাঝেমধ্যে কাউকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন এবং কয়েক দিন পর ফিরে আসতেন। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিকে শুরুতে নিখোঁজ হিসেবে তাঁরা রিপোর্ট করেননি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয়দের সহায়তায় পরে নিহত কিশোরীর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরিবারের বক্তব্য ও ময়নাতদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে হত্যা, ধর্ষণ এবং আলামত গোপন করার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। শিশু যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা আইন—পকসো (POCSO)—এর সংশ্লিষ্ট ধারাও মামলায় যুক্ত করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (আউটার নর্থ) শোভিত সাক্সেনা জানিয়েছেন, তদন্ত এখনো চলছে। ঘটনার পূর্ণ ধারাবাহিকতা নির্ধারণ, আটক ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই, ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ পরীক্ষা এবং এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার করা আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় আটক তিন কিশোরের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়াও শিশু আইনের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। অন্যদিকে ১৯ বছর বয়সী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের অভিযোগ ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতেই ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই করা হবে।