সামরিক মডেলে এক সপ্তাহেই কৌশলগত অবস্থান হারানোর আশঙ্কা, এরপর গেরিলা প্রতিরোধের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে এখনো অত্যন্ত ক্ষীণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে কানাডা এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির ভাষায় একসময় ‘সম্পূর্ণ অকল্পনীয়’ ছিল। কার্নি সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের মতো চরম ঝুঁকিও সরকারের বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো সম্ভাব্য বা প্রত্যাশিত পরিস্থিতি নয়; বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কার্নির এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কের দ্রুত পরিবর্তন। ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার কথা বলেছেন। যদিও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন, একই সঙ্গে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কথা বলেছিলেন। ফলে বাণিজ্য ও শুল্কনীতি ঘিরে বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কানাডার সামরিক বাহিনী এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে মডেল তৈরি করেছে। কানাডার সংবাদপত্র গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ দিক থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে আক্রমণ চালায়। সেই মডেল অনুযায়ী, কানাডার সামরিক বাহিনী প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করতে পারবে না। মার্কিন বাহিনী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো কয়েক দিনের মধ্যে, সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে বলে মডেলটিতে ধারণা করা হয়েছে। তবে এটি কোনো বাস্তব যুদ্ধপরিকল্পনা নয়; সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণের একটি তাত্ত্বিক কাঠামো।
এমন পরিস্থিতিতে কানাডার সম্ভাব্য প্রতিরোধ কৌশলও মডেল করা হয়েছে। প্রচলিত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকার কারণে ছোট ছোট সশস্ত্র দলের মাধ্যমে অতর্কিত হামলা, নাশকতা, ড্রোন ব্যবহার এবং আঘাত করে দ্রুত সরে যাওয়ার মতো কৌশল নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অবকাঠামোগত অবস্থান রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়লে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলার দিকে যেতে পারে কানাডা। গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রতিবেদনে এমন কৌশলের সঙ্গে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনী এবং পরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত গেরিলা কৌশলের তুলনা করা হয়েছে।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কানাডায় সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এর একটি বড় কারণ দুই দেশের সামরিক বাহিনীর গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্য। একই সঙ্গে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাডের মাধ্যমে দুই দেশ উত্তর আমেরিকার আকাশ ও মহাকাশ প্রতিরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে কাজ করছে। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম রয়েছে।
এই বাস্তবতায় দুই মিত্র দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে শুধু সামরিক সম্পর্কই নয়, ন্যাটোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। কানাডার সামরিক মডেলেও বলা হয়েছে, কোনো সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের আগে নোরাডের মতো যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অর্থাৎ সরাসরি হামলার আগে দুই দেশের কয়েক দশকের নিরাপত্তা সহযোগিতা কার্যত ভেঙে পড়তে হবে।
কানাডার জন্য আরেকটি বড় প্রশ্ন হবে মিত্রদের ভূমিকা। গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত হলে কানাডা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো ন্যাটো মিত্রদের সহযোগিতা চাইতে পারে। সামরিক মডেল নিয়ে আলোচনায় এমনও বলা হয়েছে, দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো ভেঙে পড়লে ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে কানাডা সামরিক সহায়তা চাইতে পারে। তবে এ ধরনের সহায়তা বাস্তবে কীভাবে দেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের প্রকৃতি, ন্যাটোর অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
কানাডার সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির নিয়মিত ও রিজার্ভ বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক ছোট এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম, বিমান প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে। এ কারণেই কানাডা সাম্প্রতিক সময়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্নি সরকার প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বড় বিনিয়োগ এবং সামরিক সরঞ্জাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর অংশ হিসেবে প্রায় ২০০ কোটি কানাডিয়ান ডলার ব্যয়ে ১৯০টি নতুন সাঁজোয়া যুদ্ধ-সহায়ক যান সংগ্রহের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
জনবল বাড়ানোর বিষয়টিও কানাডার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কানাডার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সম্পূরক রিজার্ভ বা অন্যান্য রিজার্ভ ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করে প্রায় ৩ লাখ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। তবে এটি এখনো একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য; এটি ইতোমধ্যে ৩ লাখ সদস্যের বাহিনী তৈরি হয়ে গেছে—এমন নয়। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কানাডার নিয়মিত বাহিনীতে প্রায় ৬৭ হাজার এবং প্রাথমিক রিজার্ভে প্রায় ২৪ হাজার ৯০০ সদস্য ছিলেন।
যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি সহজ হবে না— এমন মত দিয়েছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে থাকলেও কানাডার বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, দীর্ঘ সীমান্ত, কঠিন আবহাওয়া এবং অবকাঠামোগত বাস্তবতা একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একটি প্রচলিত যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সামরিক সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদি দখল ও নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
গ্লোব অ্যান্ড মেইলের সামরিক মডেলেও মূলত এই পার্থক্যটি উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, কানাডার বাহিনী প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে না পারলেও পরবর্তী পর্যায়ে অনিয়মিত প্রতিরোধের দিকে যেতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের ফল শুধু প্রথম কয়েক দিনের সামরিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে না; দখলকৃত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
কানাডার জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা প্রশ্নগুলোর একটি হলো আর্কটিক অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশটির উত্তরাঞ্চল বিশাল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় তাই উত্তরাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে উত্তরাঞ্চলের সার্বভৌমত্ব, সমুদ্রপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কানাডার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ কোনো ‘বেস কেস’ নয়। তাঁর প্রস্তুতির যুক্তি হলো—রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো খুব কম সম্ভাবনার হলেও বড় ধরনের ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত থাকা।
দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসেও এমন অবিশ্বাসের নজির রয়েছে। ১৮১২ সালের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছিল। সেই যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালায় এবং ব্রিটিশ বাহিনী পরবর্তীতে ওয়াশিংটনে হামলা চালিয়ে হোয়াইট হাউসসহ সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তী দুই শতকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারদের একটিতে পরিণত হয়।
এই দীর্ঘ সহযোগিতার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত যুদ্ধের বাস্তব সম্ভাবনা নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্ক কতটা বদলে গেছে। যে দুই দেশ এতদিন যৌথভাবে মহাদেশীয় আকাশ প্রতিরক্ষা পরিচালনা করেছে, তাদের একজন এখন অন্যজনের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের জন্য কাল্পনিক প্রতিরক্ষা মডেল তৈরি করছে। কানাডার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এটিই বড় পরিবর্তনের সংকেত।
কার্নির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এখনো অত্যন্ত দূরের সম্ভাবনা। কিন্তু কানাডার প্রস্তুতি দেখাচ্ছে, দেশটি আর সেই সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ধরে নিতে চাইছে না। আর যুদ্ধ সত্যিই শুরু হলে প্রথম ধাক্কায় সামরিক ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকলেও পরবর্তী লড়াইয়ের ধরন, ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা, কানাডার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আন্তঃনির্ভরতার পরিণতি—সব মিলিয়ে সংঘাতটি উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই আমূল বদলে দিতে পারে।