লাঠিপেটা, কাঁদুনে গ্যাস, পেলেট গান থেকে এআই নজরদার
ভারতে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হস্তক্ষেপও বেড়েছে। কোথাও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে লাঠি ও কাঁদুনে গ্যাস, কোথাও জলকামান ও পেলেট গান। এর পাশাপাশি বাড়ছে গণগ্রেপ্তার, চলাচলে বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির ব্যবহার। এসব ব্যবস্থার প্রয়োগ কতটা প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকারকর্মী ও অধিকার সংগঠনগুলো।
বিশেষ করে চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে যুব আন্দোলন ও অন্যান্য দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অন্যদিকে, সরকার ও পুলিশের বক্তব্য—জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সহিংসতা ঠেকাতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ভারতের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতি, সেগুলোর আইনি সীমা এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনা কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বাড়ছে বিক্ষোভ, বাড়ছে পুলিশের হস্তক্ষেপ
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের (এসিএলইডি) তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর পর্যন্ত ভারতে ১৮ হাজার ৬২৯টি বিক্ষোভ-সমাবেশের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৬৯১টি ছিল প্রতিবাদ কর্মসূচি, যার বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। সহিংস বিক্ষোভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ৬৮৭টি ঘটনা। অন্তত ১ হাজার ২০০টি বিক্ষোভে পুলিশ হস্তক্ষেপ করেছে।
২০১৬ সালে ভারতে বিক্ষোভ-সমাবেশের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৪২। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২২ হাজার ১৩০-এ পৌঁছায়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশজুড়ে আড়াই হাজারের বেশি বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। ওই মাসে দুই শতাধিক ঘটনায় পুলিশ বলপ্রয়োগ করেছে, যা এক মাসের হিসাবে গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রাজ্যভেদেও বিক্ষোভের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। তেলেঙ্গানায় ২০১৬ সালে ৯৮টি বিক্ষোভের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৩২৪ ছাড়িয়েছে। তামিলনাড়ু ও অন্ধ্রপ্রদেশেও বিক্ষোভের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে বিক্ষোভের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই সব সমাবেশ সহিংস—এমন নয়। তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রতিবাদ কর্মসূচিই শান্তিপূর্ণ ছিল। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজন এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
কখন হস্তক্ষেপ করতে পারে পুলিশ
ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) ও ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ এবং নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত। তবে জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সংবিধানের ১৯(২) ও ১৯(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।
এর অর্থ, বিক্ষোভ হলেই পুলিশ নির্বিচারে বলপ্রয়োগ করতে পারে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ প্রথমে ব্যারিকেড দিতে, সমাবেশের আয়োজকদের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং সতর্কবার্তা দিয়ে বিক্ষোভকারীদের সরে যেতে বলতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আইনসম্মতভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ভারতের পুলিশি নির্দেশিকায় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে আলোচনা ও সতর্কতা, এরপর প্রয়োজন হলে ন্যূনতম মাত্রার বলপ্রয়োগ এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা বন্ধ করা—এই নীতিই নির্দেশনার মূল কথা। আইনসম্মত নির্দেশ অমান্য করে সমাবেশস্থল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কাউকে আটক করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রেও আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
ভারতের পুলিশের ১৯৮৫ সালের আচরণবিধি এবং ২০১১ সালে বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্রণীত মানসম্মত পরিচালনাপদ্ধতিতে অহিংস ব্যবস্থা ও বলপ্রয়োগের সীমা নিয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৬ সালে পুলিশের গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
কিন্তু লিখিত নির্দেশনা থাকলেই মাঠপর্যায়ে তা অনুসরণ করা হচ্ছে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—পরিস্থিতি মোকাবিলায় বলপ্রয়োগ সত্যিই প্রয়োজন ছিল কি না, প্রয়োগ করা শক্তি ছিল আনুপাতিক কি না এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরও তা অব্যাহত ছিল কি না।
ব্যারিকেড ও লাঠিপেটা
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রথম দিকের ব্যবস্থাগুলোর একটি ব্যারিকেড। এর মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত করা, নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রবেশপথ সুরক্ষিত রাখা হয়। তবে ব্যারিকেড স্থাপন বা অতিক্রমের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা, অনুমতি ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ব্যারিকেড ভাঙার ঘটনাও সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেখা গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতিগুলোর একটি লাঠিপেটা। ঔপনিবেশিক আমল থেকে ব্যবহৃত এই পদ্ধতিতে আগে বাঁশের লাঠি বেশি ব্যবহৃত হলেও এখন বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম উপাদানে তৈরি লাঠিও ব্যবহার করা হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে ভারত সরকারের নথির বরাতে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে লাঠিপেটার ঘটনায় ৬৬ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় নারী বিক্ষোভকারীদের লাঠি দিয়ে আঘাত করার ঘটনায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতিবাদ জানায়।
লাঠির আঘাতে মাথা, ঘাড়, মেরুদণ্ড ও পেটের মতো সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর আঘাত লাগতে পারে। তাই বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন, স্থান ও তীব্রতা গুরুত্বপূর্ণ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার নামে এমন শক্তি প্রয়োগ করা হলে, যাতে গুরুতর আঘাত বা প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হয়, তা নিয়ে মানবাধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ দেখা দেয়।
জলকামান ও কাঁদুনে গ্যাস
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামানও ব্যবহার করে ভারতীয় পুলিশ। এই যন্ত্র দিয়ে পানির প্রবাহ ছুড়ে জনতাকে পেছনে সরানোর চেষ্টা করা হয়। তবে উচ্চচাপের পানির আঘাতে চোখ, কান ও শরীরের অন্যান্য অংশে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। পানি ছোড়ার ফলে কেউ পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
ভারতে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে ‘বরুণ’ নামের জলকামান ব্যবস্থার ব্যবহার রয়েছে। তবে এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
আরেকটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি কাঁদুনে গ্যাস। এর রাসায়নিক উপাদান চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে এবং সাময়িকভাবে শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে। বদ্ধ বা সীমিত জায়গায় গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই কোথায়, কীভাবে এবং কতটা পরিমাণে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন টিয়ার স্মোক ইউনিটে তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করে। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এসব উপকরণের প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে এসব উপকরণ প্রয়োগ করলে তা প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পেলেট গান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত সবচেয়ে বিতর্কিত অস্ত্রগুলোর একটি পেলেট গান। সাধারণত ১২ গেজের বন্দুক থেকে ধাতব বা প্লাস্টিকের ছোট ছোট ছররা নিক্ষেপ করা হয়। এসব ছররা শরীরে বিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখম, দৃষ্টিশক্তি হারানো কিংবা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কাশ্মীরে পেলেটের আঘাতে বহু মানুষের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা সামনে আসার পর ২০১৬ সালে ভারতে এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা হয়। বিকল্প ব্যবস্থার সুপারিশ করা হলেও পেলেট গান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেলেট গান নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন। এদিকে ২০২০ সালের জাতিসংঘের নির্দেশিকায় ধাতব পেলেট ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় পেলেট গানের গুলিতে আহত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নির্ধারণে প্রত্যক্ষ প্রমাণ, চিকিৎসা নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে কঠোর সীমা
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুতর। কারণ, গুলিতে প্রাণহানি বা স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি থাকে। পুলিশি নির্দেশনায় জীবন বা সম্পদের ওপর তাৎক্ষণিক গুরুতর বিপদ তৈরি হলে চরম পরিস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপের আগে সতর্কবার্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গুলি চালানো হলে তার কারণ, ব্যবহৃত গোলাবারুদের হিসাব এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও জবাবদিহির অংশ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বলপ্রয়োগ বন্ধ করা প্রয়োজন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া কোনো পদক্ষেপ যেন শাস্তি দেওয়ার উপায়ে পরিণত না হয়, সেটিও আইনি ও মানবাধিকার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নজরদারি
শারীরিক বলপ্রয়োগের পাশাপাশি বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে দিল্লিতে যুব আন্দোলনের বিক্ষোভের সময় পুলিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির জন্য বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করে। সিপি প্লাসের ‘ইক্ষণ’ প্রযুক্তির মাধ্যমে জনসমাগমের আকার পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধের ইতিহাস রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অক্টোবরের বিক্ষোভে একই ধরনের গাড়ি দেখা না গেলেও ঘটনাস্থলে পুলিশের শরীরে লাগানো ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি নজরে আসে।
প্রযুক্তির সাহায্যে জনসমাগম পর্যবেক্ষণ ও অপরাধ তদন্ত সহজ হতে পারে। তবে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নির্ভুলতা, ভুল ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি, ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ এবং সেই তথ্যের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
দিল্লিভিত্তিক ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, যথেষ্ট আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহি ছাড়া এ ধরনের নজরদারি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সরকারের যুক্তি হলো, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনস্বার্থ রক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক কি না, এবং সংগৃহীত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব প্রশ্নেরও জবাব থাকা দরকার।
ইন্টারনেট বন্ধ, চলাচলে বিধিনিষেধ ও আটক
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও প্রশাসনের আরেকটি কৌশল হলো মানুষের চলাচল সীমিত করা, গণপরিবহন বন্ধ রাখা, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিক্ষোভকারীদের আটক করা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের যুব বিক্ষোভের সময় দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখতে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভস্থলের কাছাকাছি কয়েকটি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ রাখা হয়।
অক্টোবরে মেট্রো পরিষেবা ও স্টেশন ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে আবারও বিতর্ক দেখা দেয়। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ছিল। তবে ভারতের সলিসিটর জেনারেল দাবি করেন, মেট্রো পরিষেবা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলেছে।
১১ অক্টোবরের শুনানিতে গণগ্রেপ্তার বন্ধ করা এবং মেট্রো, রেল ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আদালতে নির্দেশনার প্রসঙ্গ ওঠে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রয়োজনে আইনসম্মত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রয়েছে।
বিক্ষোভস্থলের বাইরেও লোকজনকে আটক করার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার আগে বিমানবন্দর থেকে আন্দোলনের দুই নেতাকে আটক করা হয়। পরদিন শুনানিতে আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এলাকার বাইর থেকেও পুলিশ লোকজনকে তুলে নিয়ে গেছে।
আদালতে দেওয়া বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার মূল বিষয় হলো, আটক করতে হলে তার আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেওয়ার কারণে কাউকে আটক করা হলে সেই পদক্ষেপের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকা দরকার।
জাতিসংঘের একটি সংস্থা নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সম্মান করার আহ্বান জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই আহ্বানকে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে এবং পুলিশ আইন মেনেই কাজ করেছে বলে দাবি করে।
অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
দিল্লিতে জুলাইয়ের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করা হয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও পেলেট গান, কাঁদুনে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠি ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এসব ব্যবহারের কিছু ঘটনা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং ভারতের নিজস্ব নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
দিল্লি পুলিশ বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র ও পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছে, অতীতে অপরাধে জড়িত ছিলেন—এমন কিছু ব্যক্তি বিক্ষোভে সহিংস হয়ে উঠেছিলেন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, নির্দিষ্ট ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র এবং বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে তদন্ত ও প্রমাণের গুরুত্ব রয়েছে।
জুলাইয়ের বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট একটি কমিটি গঠন করে। অক্টোবরের বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ ও আটকের অভিযোগ নিয়েও আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ, সরকারি বক্তব্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণকে পৃথকভাবে দেখা জরুরি।
ভারতের সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার, পুলিশের জবাবদিহি, নজরদারি প্রযুক্তির সীমা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়েও বিতর্ক সামনে এনেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা—এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য কতটা বজায় থাকছে, তা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।