মন্টেবেলোতে সাজিয়া হক, পেরিসে মোহাম্মদ রহমান ও চিনোতে এম এস আলম
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রচেষ্টার মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার তিন শহরের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন প্রার্থী। তাঁরা হলেন লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির মন্টেবেলো শহরে সাজিয়া হক, রিভারসাইড কাউন্টির পেরিস শহরে মোহাম্মদ রহমান এবং সান বার্নার্ডিনো কাউন্টির চিনো শহরে এম এস আলম। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের সমর্থন পেতে প্রচার চালাচ্ছেন তাঁরা।
তিন প্রার্থীর নির্বাচনী অগ্রাধিকার এক নয়। সাজিয়া হক গুরুত্ব দিচ্ছেন নগর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় ব্যবসার বিকাশে। মোহাম্মদ রহমানের প্রচারে রয়েছে জননিরাপত্তা, সাশ্রয়ী আবাসন ও পাড়া-মহল্লার নাগরিক সুবিধা। আর প্রকৌশলী এম এস আলম পরিকল্পিত নগরায়ণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।
তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সদস্যরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন, কেউ তহবিল সংগ্রহে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহ ও মানসিক সমর্থন জোগাচ্ছেন। প্রার্থীদের জন্য এই সহযোগিতা নির্বাচনী প্রচার চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।
মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান সাজিয়ার
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির মন্টেবেলো শহরের সিটি কাউন্সিলের ডিস্ট্রিক্ট ১ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাজিয়া হক। এ আসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জর্জিনা তামায়ো, কিম্বারলি কোবোস ক্যাথর্ন ও রাফায়েল সান্তোয়া। মন্টেবেলো শহরের সরকারি নির্বাচনী তালিকায় তাঁর নাম ‘শাজিয়া হক’ (Shazia Hoq) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসা, লেখালেখি ও কমিউনিটি নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত সাজিয়া হক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা ও কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে তিনি নগর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, দায়িত্বশীল বাজেট ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পাড়া-মহল্লা এবং স্থানীয় ব্যবসার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। শহরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাসিন্দাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নাগরিকদের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করাও তাঁর অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে সাজিয়া হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নারী হিসেবে আমি মনে করি, আমেরিকায় আমরা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি। যেহেতু আমরা আমেরিকায় বসবাস করি, তাই আমেরিকার সুযোগ-সুবিধা পেতে হলে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে আমাদের জড়িত হতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আমাদের সেই পথ দেখাতে হবে।’
তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করতে চান তিনি।
জননিরাপত্তা ও আবাসনে গুরুত্ব মোহাম্মদ রহমানের
রিভারসাইড কাউন্টির পেরিস শহরের সিটি কাউন্সিলের ডিস্ট্রিক্ট ১ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোহাম্মদ রহমান। এ আসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গুয়াদালুপে গোমেজ ও হুয়ান কার্লোস (জেসি) ফ্রাঙ্কো। পেরিস শহরের সরকারি নির্বাচনী ওয়েবসাইটেও মোহাম্মদ রহমানের প্রার্থিতা এবং এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম রয়েছে। মোহাম্মদ রহমান যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগে ২৭ বছর ধরে কাজ করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তাঁর নির্বাচনী প্রচারে কাজে আসছে বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচার সম্পর্কে মোহাম্মদ রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ডাক বিভাগে কাজ করার সুবাদে গড়ে ওঠা পরিচিতি তাঁকে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে সহায়তা করছে। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী।
তাঁর নির্বাচনী পরিকল্পনায় জননিরাপত্তা, সাশ্রয়ী আবাসন, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ এবং তরুণদের জন্য আরও সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পাড়া-মহল্লায় কমিউনিটি পুলিশিং ও নেইবারহুড ওয়াচ কার্যক্রম জোরদার করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং ফুটপাতের মতো নাগরিক সুবিধা উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় সরকারের এসব উদ্যোগ বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নিরাপদ সড়ক, ভালো ফুটপাত, কার্যকর জননিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী আবাসনের মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন মোহাম্মদ রহমান।
প্রকৌশল ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চান এম এস আলম
সান বার্নার্ডিনো কাউন্টির চিনো শহরের সিটি কাউন্সিলের ডিস্ট্রিক্ট ৩ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এম এস আলম। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান কাউন্সিল সদস্য মার্ক লুসিও। চিনো শহরের সরকারি নির্বাচনী তথ্যে এম এস আলম ও মার্ক লুসিওর নাম প্রার্থীসংক্রান্ত নথিতে রয়েছে।
পেশায় প্রকৌশলী এম এস আলম ক্যালিফোর্নিয়া পরিবহন বিভাগ—ক্যালট্রান্সের ডিস্ট্রিক্ট ৭-এ পূর্ণকালীন প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, লং বিচে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। পরিবহন প্রকৌশল নিয়ে ইউসিএলএতে গবেষণা ও ডক্টরাল পর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। তিনি ১৮ বছর ধরে চিনো শহরে বসবাস করছেন।
আলমের নির্বাচনী প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শক্তিশালী অবকাঠামো, দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহরের উন্নয়ন এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে বর্তমান বাসিন্দাদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সুযোগ তৈরি হয়।
নির্বাচনী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে এম এস আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারপত্রে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।
প্রকৌশল ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নগর পরিকল্পনা, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোর উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান তিনি। শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন ও বাসিন্দাদের সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়াই তাঁর প্রচারের অন্যতম দিক।
স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
তিন প্রার্থীর নির্বাচনী প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও তাঁদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে—স্থানীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি-আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা। সাজিয়া হক মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি-আমেরিকান নারীদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন। মোহাম্মদ রহমান আবাসন, জননিরাপত্তা ও পাড়া-মহল্লার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আর এম এস আলম প্রকৌশল ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে সিটি কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা, স্থানীয় অবকাঠামো, আবাসন, জননিরাপত্তা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবার বিষয়ে শহরভেদে সিটি কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ফলে এসব পদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।
বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির সদস্যদের সহায়তা প্রার্থীদের প্রচারে ভূমিকা রাখছে। তবে নির্বাচনে জয় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর। ৩ নভেম্বরের ভোটে মন্টেবেলো, পেরিস ও চিনোর ভোটাররা তাঁদের সিটি কাউন্সিলে কাদের দেখতে চান, তা নির্ধারণ করবেন।
তিন প্রার্থীর জন্য এই নির্বাচন কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের সুযোগও। তাঁরা নির্বাচিত হলে নিজ নিজ শহরের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি-আমেরিকানদের উপস্থিতি বাড়বে। আর ফল যা-ই হোক, তাঁদের প্রার্থিতা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির অংশগ্রহণের আলোচনাকে সামনে এনেছে।