জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো ও সরকারি নীতির প্রতিবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স থেকে আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম থেকে ইতালি—বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক, পেনশনভোগী ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দেশভেদে আন্দোলনের কারণ আলাদা হলেও মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, সরকারি সেবায় ব্যয় সংকোচন এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা অনেক বিক্ষোভের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউরোপের কয়েকটি দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ তীব্র হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সে বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
ফ্রান্সে মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে আন্দোলন চলছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ ফ্রান্স ২৪-কে জানিয়েছেন, ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে ক্ষোভের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভ করেছেন প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষা খাতে অর্থায়নের প্রশ্নে। পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষও তাতে যুক্ত হয়। কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।
বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয় সংকোচন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ফি বৃদ্ধি ও সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ব্রাসেলস ও লিয়েজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর জলকামান ব্যবহার করা হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন বিক্ষোভের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন।
পর্তুগালে বাড়িভাড়া, আবাসন সংকট ও কম মজুরির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন। রাজধানী লিসবনসহ বিভিন্ন শহরে বাড়ি কেনা ও ভাড়া নেওয়ার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তরুণ কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো চাপে পড়েছে। ইতালিতেও স্থবির মজুরি, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। মিলানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ শিক্ষাব্যয়, আর্থিক সহায়তার অভাব ও স্নাতক শেষে চাকরি পাওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে আন্দোলন করছেন। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীদের একাংশ ভবন লক্ষ্য করে ইট ও কংক্রিটের টুকরা ছুড়লে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। পরে আন্দোলনে বেকারত্ব ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করছে বিরোধী দল ও তাদের সমর্থকেরা। দেশটির বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতাকারীরা ‘নো কিংস’ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন শহর ও এলাকায় সমাবেশ করেছেন। আয়োজকদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। কর্মসূচিগুলোকে দলনিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হলেও ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি নিয়ে অসন্তুষ্ট মানুষেরা এতে অংশ নিয়েছেন।
আর্জেন্টিনায় প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ করেছেন। বুয়েনস এইরেসে পার্লামেন্টের বাইরে হাজারো মানুষের সমাবেশের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পাথর ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
মিলেই ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে উচ্চশিক্ষা খাতে অর্থায়ন নিয়ে এটি পঞ্চম বড় বিক্ষোভ বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবির পক্ষে আদালতের একাধিক নির্দেশনার পরও এ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
তুরস্কে গত মাসে মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত পেনশন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করেছে। রাজধানী আঙ্কারায় পেনশনভোগীরা সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব আন্দোলনকে একটি অভিন্ন কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও শিক্ষা ও জনসেবায় অর্থায়ন নিয়ে অসন্তোষ, কোথাও আবাসন ও মজুরির সংকট, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন বিক্ষোভের প্রধান চালিকাশক্তি। তবে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়ালে সরকারি নীতি নিয়ে অসন্তোষও তীব্র হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন দেশে এসব বিক্ষোভ সরকারের সামনে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, জনসেবার মান ও নাগরিকদের আস্থার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। তবে আন্দোলনগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর প্রতিক্রিয়া, দাবিদাওয়ার অগ্রগতি এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংলাপের ওপর।