হেক্টরে ফলন ৯ থেকে ১১ টন, অবমুক্ত হয়েছে নতুন আট জাত
খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো। দেশটির বিজ্ঞানীরা মিউটেশন প্রজনন পদ্ধতি ব্যবহার করে ধানের আটটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। এসব জাতের ধান পরিপক্ব হতে সময় লাগে মাত্র ৯৫ থেকে ১০৬ দিন। অনুকূল পরিস্থিতিতে হেক্টরপ্রতি ফলন পাওয়া যাচ্ছে ৯ থেকে ১১ টন, যেখানে দেশটির প্রচলিত জাতগুলোর ফলন সাধারণত ৪ থেকে ৬ টন। নতুন জাতগুলোর সম্প্রসারণ করা গেলে দেশটির চালের উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালের জুনে উন্নত প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত ১১টি সম্ভাবনাময় ধানের লাইন থেকে আটটিকে বুরকিনা ফাসোর উদ্ভিদ প্রজাতি ও জাতের জাতীয় তালিকায় নিবন্ধন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগ ‘অ্যাটমস৪ফুড’ প্রকল্পের সহায়তায় এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত জাতগুলোকে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
বুরকিনা ফাসোতে চালের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গত এক দশকে দেশটিতে চালের ব্যবহার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক চাল আমদানি করতে হয়। ফলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি এখন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বেশি ফলনশীল, দ্রুত পরিপক্ব এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম ধানের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন দেশটির বিজ্ঞানীরা। তাঁদের লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; কৃষকের চাষাবাদের বাস্তবতা, স্থানীয় আবহাওয়া এবং ভোক্তাদের চালের ধরন ও গুণগত মানসংক্রান্ত পছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া।
যেভাবে কাজে লাগানো হয়েছে পারমাণবিক প্রযুক্তি
নতুন জাত উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন ‘মিউটেশন ব্রিডিং’ বা মিউটেশন প্রজনন পদ্ধতি। এতে বিকিরণসহ নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কৌশলের মাধ্যমে বীজ বা উদ্ভিদে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উদ্ভিদ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করা হয়। এরপর গবেষকেরা সেসব গাছের মধ্য থেকে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যযুক্ত গাছ নির্বাচন করে একাধিক প্রজন্ম ধরে পরীক্ষা ও বাছাই করেন।
এ পদ্ধতিতে সরাসরি কোনো তেজস্ক্রিয় ধান উৎপাদন করা হয় না। বরং উদ্ভিদের জিনগত বৈচিত্র্য বাড়িয়ে প্রচলিত প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত নির্বাচন করা হয়। দ্রুত পরিপক্বতা, বেশি ফলন ও শস্যের গুণগত মানের মতো বৈশিষ্ট্য উন্নয়নে এ প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে।
আইএইএ ও এফএওর কারিগরি সহায়তায় বুরকিনা ফাসোর গবেষকেরা মিউটেশন প্রজনন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং সম্ভাবনাময় ধানের লাইন উন্নয়ন ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত ধানের লাইনকে কৃষকের জন্য ব্যবহারযোগ্য জাত হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ফলনের পাশাপাশি চালের গুণগত মানে গুরুত্ব
নতুন আটটি জাতের বৈশিষ্ট্য এক রকম নয়। কয়েকটি জাতের বিশেষত্ব বেশি ফলন ও দ্রুত পরিপক্বতা; অন্যগুলোর মধ্যে রয়েছে চালের আকার, শ্বেতসারের ধরন এবং রান্নার পর গঠনের ভিন্নতা। উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে দুটি বড় দানার চাল, দুটি প্রতিরোধী শ্বেতসার বা রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চসমৃদ্ধ চাল এবং একটি আঠালো বৈশিষ্ট্যের চাল রয়েছে।
প্রতিরোধী শ্বেতসার সাধারণ শ্বেতসারের তুলনায় ক্ষুদ্রান্ত্রে তুলনামূলক কম হজম হয় এবং এর কিছু অংশ বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞানে এটি নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ধানের জাতের পুষ্টিগত সুবিধা নিশ্চিতভাবে তুলে ধরতে হলে তার শ্বেতসারের পরিমাণ, গঠন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে পরীক্ষালব্ধ তথ্য প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বড় দানার চাল কিংবা আঠালো চালের আলাদা বাজার ও ভোক্তাচাহিদা থাকতে পারে। ফলে নতুন জাতগুলোর বৈচিত্র্য কৃষকদের উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারে পছন্দ অনুযায়ী চাল সরবরাহের সুযোগও বাড়াতে পারে।
জোসেফ কিয়েরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইমায়েল অঁরি নেস্তর বাসোলে বলেন, এই অর্জনের গুরুত্ব শুধু আটটি নতুন জাত উদ্ভাবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের আওতায় আইএইএ ও এফএওর সহযোগিতায় বুরকিনা ফাসোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার সক্ষমতা বেড়েছে। এর ফলে জলবায়ু ও চাষাবাদের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষক ও ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ ভবিষ্যতেও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
গবেষণাগার থেকে কৃষকের মাঠে
নতুন কোনো ধানের লাইন উদ্ভাবন করলেই তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় না। প্রথমে স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ায় এর কার্যকারিতা যাচাই করতে হয়। এরপর একাধিক পর্যায়ে মাঠপরীক্ষা, ফলন মূল্যায়ন, কৃষক ও ভোক্তাদের মতামত সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়, নতুন জাতটি বাস্তব চাষাবাদে কতটা কার্যকর এবং কৃষকের জন্য কতটা লাভজনক।
বুরকিনা ফাসোর গবেষকেরা মিউটেশন প্রজনন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। ২০২৫ সালের জুনে ১১টি সম্ভাবনাময় ধানের লাইন থেকে আটটি জাত জাতীয় তালিকায় নিবন্ধিত হওয়া সেই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এখন এসব জাতের বীজ উৎপাদন বাড়িয়ে আরও বেশি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। বামা ও বানজোনে প্রদর্শনী খামারে স্থানীয় পরিবেশে জাতগুলোর কার্যকারিতা যাচাই এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজও অব্যাহত রয়েছে। নতুন জাতগুলোর ভালো বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ধান উদ্ভাবন এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
খাদ্য ও কৃষিতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারবিষয়ক যৌথ এফএও-আইএইএ কেন্দ্রের পরিচালক দংশিন ফেং বলেন, বুরকিনা ফাসোর এই অগ্রগতি দেখিয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বুরকিনা ফাসোতে ২০২৫ সালের মে মাসে অ্যাটমস৪ফুড প্রকল্পের আওতায় প্রথম যৌথ মূল্যায়ন মিশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই মিশনে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নতুন আট জাতের নিবন্ধন দেশটির ধান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও আমদানিনির্ভরতা কমানোর সাফল্য নির্ভর করবে আরও কয়েকটি বিষয়ের ওপর—পর্যাপ্ত মানসম্মত বীজ উৎপাদন, কৃষকের কাছে বীজ পৌঁছানো, স্থানীয় পরিবেশে ধারাবাহিক ফলন, উৎপাদন খরচ এবং বাজারে চালের চাহিদা। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য এলে দ্রুত পরিপক্ব ও বেশি ফলনশীল জাতগুলো বুরকিনা ফাসোর খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।