একাত্তরে দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর যুক্ত হয়েছিলেন জনসেবায়, নির্বাচিত হয়েছিলেন জনপ্রতিনিধি। নারীশিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিদ্যালয়। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এখন ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। জীবনের এই কঠিন সময়ে তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মানী বন্ধের সিদ্ধান্তকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সম্মানী পুনরায় চালু হয়নি।
সাহাবুদ্দিনের পরিবারের কাছে বিষয়টি কেবল অর্থপ্রাপ্তির নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও মর্যাদার। তাঁর ছেলে সাজ্জাদ হাসাইন কিশোর বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে আমরা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চাই না, আমাদের দাবি, বাবার বীর মুক্তিযোদ্ধার খেতাব ও সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হোক। পাশাপাশি আমাদের বাবার দ্রুত রোগমুক্তি কামনায় সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’
গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, ১১ বছর পেয়েছেন সম্মানী
সাহাবুদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সিটি গ্রুপ কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা কমান্ডসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সনদ ও প্রত্যয়নপত্র ছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৫ সালের ২৯ মে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এসব নথির ভিত্তিতে তিনি ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মানী পেয়েছেন। পরে ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির একটি বিভক্ত সিদ্ধান্তের পর তাঁর সম্মানী বন্ধ হয়ে যায়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, কমিটির ছয়জন সদস্য সাহাবুদ্দিনের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। একজন সদস্য নেতিবাচক মত দেন। ওই সদস্যের মতামতে স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁর সম্মানী বন্ধ রাখার পদক্ষেপ বহাল রাখে বলে মামলার বিবরণে বলা হয়েছে। ভাতা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাহাবুদ্দিন জামুকায় আপিল করেন। কিন্তু তাঁর আপিল খারিজ করে উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ওই সিদ্ধান্তসংক্রান্ত চিঠি জারি করা হয় একই বছরের ৩১ জুলাই। প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন সাহাবুদ্দিন। তাঁর করা রিট পিটিশন নম্বর ১১১৩৫/২০২৩-এ ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মূল রুল জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে আপিল খারিজের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল সম্পূরক রুল জারি করা হয়।
মামলার রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, আদালত মূল রুলটি আবেদনকারী আর অগ্রসর না করায় নিষ্পত্তি করেন। তবে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল জারি করা সম্পূরক রুল মঞ্জুর করা হয়। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের আপিল খারিজসংক্রান্ত চিঠি এবং ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির বিভক্ত সিদ্ধান্ত বহাল রাখার পদক্ষেপকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী সাহাবুদ্দিনকে মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে রায়ের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।
সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আতাউল-আল ওসমানের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেনি। তাঁর ভাষ্য, আপিলের সুযোগ পেরিয়ে যাওয়ায় রায় বাস্তবায়ন করা ছাড়া অন্য পথ নেই। নির্দেশ কার্যকর না করার বিষয়টি আদালত অবমাননার প্রশ্নও তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
সাহাবুদ্দিনের মামলায় সম্মানী বন্ধের সিদ্ধান্তকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও আইনগত ভিত্তির প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত। ৩১ অনুচ্ছেদে আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার ও আইনগত সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ১০২ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট শর্তে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক পর্যালোচনা ও প্রতিকার দেওয়ার ক্ষমতা নির্ধারিত হয়েছে।
কোনো ব্যক্তির প্রাপ্য সুবিধা বন্ধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছিল কি না এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক কমিটির সিদ্ধান্ত থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত হয়ে যায় না; সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও প্রক্রিয়াও আইন অনুযায়ী হতে হয়।
সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে সরকারি গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্তি, বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সনদ এবং দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় সম্মানী পাওয়ার পর কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্মানী বন্ধ করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির বিভক্ত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁর পক্ষে থাকা নথিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি ও পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অন্য মামলাতেও উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপের নজির
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রীয় সম্মানী বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে এর আগেও উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর রিট পিটিশন নম্বর ৯৯৮৩/২০২৩-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ শহিদুল ইসলামের পক্ষে রায়ের তথ্য রয়েছে। রিট পিটিশন নম্বর ৬৭৭৫/২০২৩-এ ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ উল্লাহর সম্মানী বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর রিট পিটিশন নম্বর ১৪০৯২/২০২২-এ ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত বাতিল ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়ার তথ্য রয়েছে।
২০১৯ সালে চাঁদপুর, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও পাবনার ২০৮ মুক্তিযোদ্ধার নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত এবং মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৯ সালে ৩৬৬ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মানী ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণার নজিরের কথাও বলা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে জনপ্রতিনিধি, নারীশিক্ষার প্রসারেও ভূমিকা
প্রকাশিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আলহাজ মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের জন্ম ১৯৪২ সালে। তাঁর পিতা বিলাল সরদার, মাতা আজিমুন নেছা। তাঁর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশীপুর মধ্যপাড়া এলাকায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর তিনি স্থানীয় জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৮ সালে একই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।
এলাকার মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কাশীপুর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়। জীবনীতে তাঁকে বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ কালচারাল ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের সদস্য এবং কাশীপুর অগ্রদূত সামাজিক সংস্থার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে ওই সামাজিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত থাকার তথ্যও রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর জনসেবা, স্থানীয় সরকার পরিচালনা ও নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর সম্পৃক্ততা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরিবারের কাছে তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মানী বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু অর্থপ্রাপ্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্নও।
আইনি লড়াইয়ের মধ্যে আইসিইউতে, পরিবারের দোয়া প্রার্থনা
রাষ্ট্রীয় সম্মানী নিয়ে আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে সাহাবুদ্দিনের। পরিবারের ভাষ্য, তিনি ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে আইসিইউতে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
ছেলে সাজ্জাদ হাসাইন কিশোরের বক্তব্যে পরিবারের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট—তাঁরা বাবার মুক্তিযোদ্ধার খেতাব ও সম্মান ফিরে পেতে চান। একই সঙ্গে তাঁর রোগমুক্তির জন্য সবার দোয়া কামনা করছেন।
একদিকে হাইকোর্টের রায়, অন্যদিকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ—পরিবারের জন্য সময়টি গভীর উদ্বেগের। যে মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, স্বাধীনতার পর জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে এসে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন পরিবারের প্রত্যাশা, আদালতের রায় কার্যকর হবে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দিনের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর দোয়া তাঁদের এই কঠিন সময়ে শক্তি জোগাবে।