আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচ। তাই বুয়েনস আয়ার্সের মঙ্গলবার রাতটা ছিল অন্য সব রাতের চেয়ে আলাদা। মনুমেন্টালের গ্যালারিতে আসা প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক জানতেন, এমন রাত আর ফিরে আসবে না। তাই বিদায়ের মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আবেগ, ভালোবাসা আর উৎসব—সবকিছুই যেন একসঙ্গে হাজির হয়েছিল।
আর মেসিও বিদায় নিলেন মেসির মতো করেই—গোল করলেন, দুটি গোলে অবদান রাখলেন, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করলেন। মাঠে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি গায়ে তাঁর সেই চেনা ছন্দই দেখা গেল। শেষ পর্যন্ত রাতটি হয়ে উঠল কাঁদারও, কাঁদানোরও।
ম্যাচ শুরুর আগেই মনুমেন্টালে শুরু হয়েছিল বিদায় আয়োজন। স্টেডিয়ামে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বিশাল ১০ নম্বর জার্সি। তাতে লেখা—‘ধন্যবাদ’। গ্যালারির প্রায় প্রতিটি আসনেই ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। অধিকাংশের পিঠে একই নাম—মেসি।
মাঠে মেসি প্রবেশ করতেই আতসবাজির আলোয় ঝলসে ওঠে স্টেডিয়াম। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। জাতীয় সংগীতের সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। চোখ বেয়ে নেমে আসে জল। গ্যালারিতে থাকা তাঁর পরিবারের সদস্যদের চোখেও তখন পানি। কান্না থামাতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনি, নিকোলাস ওটামেন্ডি ও এনজো ফের্নান্দেজও।
বিদায়ী ম্যাচে প্রতিপক্ষ বেনিনও ভুলে যায়নি মেসিকে। টসের আগে উপহার দেওয়া হয় অ্যামাজন জঙ্গলের আদলে তৈরি একটি স্মারক এবং চিঠি। তারপর শুরু হয় সেই ম্যাচ, যার প্রতিটি মিনিট যেন ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছিল।
মেসির পায়ে প্রথমবার বল যেতেই গর্জে ওঠে মনুমেন্টাল। কিন্তু বিদায়ী রাত বলেই নিজের জন্য আলাদা কিছু করার চেষ্টা করেননি তিনি। বরাবরের মতোই ফাঁকা জায়গা খুঁজেছেন, সতীর্থদের সঙ্গে পাস খেলেছেন, আক্রমণের ছন্দ তৈরি করেছেন।
সপ্তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে তাঁর নেওয়া শট কোনোরকমে ঠেকিয়ে দেন বেনিনের গোলরক্ষক। তিন মিনিট পর, ম্যাচের দশম মিনিটে, মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে সম্মান জানাতে খেলা থামিয়ে দেন রেফারি। গ্যালারি, সতীর্থ ও সাপোর্ট স্টাফ—সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দেন। আবার জ্বলে ওঠে আতসবাজি। মেসি হাসিমুখে গ্রহণ করেন সেই ভালোবাসা।
প্রথমার্ধে গোল না হলেও আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পষ্ট। বেনিন অবশ্য রক্ষণ জমাট রেখে মেসিদের আটকে রাখে। বিরতির পর সেই প্রতিরোধ ভাঙে। মেসির পাস থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন ওটামেন্ডি। বিশ্বকাপজয়ী এই ডিফেন্ডারেরও জাতীয় দলের শেষ ম্যাচ ছিল এটি।
এরপর মেসির সামনে আসে আরও একটি সুযোগ। ফ্রি-কিক থেকে গোলের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাঁর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে দ্বিতীয় গোলের জন্য বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি আর্জেন্টিনাকে। ডান দিক থেকে নিকো পাজ ভেতরে ঢুকে বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান।
তারপর আসে রাতের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।
৬৯ মিনিটে বেনিনের অগাস্তিন এনদিয়ায়ে বক্সের ভেতর ফাউল করলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সতীর্থরা মেসিকে ঘিরে দাঁড়ান। শেষ ম্যাচে শেষবারের মতো কি ১২ গজ থেকে গোল করবেন অধিনায়ক?
মেসি বলটি পেনাল্টি স্পটে বসালেন। মনুমেন্টাল তখন নিস্তব্ধ। এরপর তাঁর বাঁ পায়ের জোরালো শট কোনাকুনি গিয়ে জালে জড়াল। গোল।
এক মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হলো পুরো স্টেডিয়াম। সতীর্থরা ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। মেসি হাত তুলে অভিবাদন জানালেন গ্যালারিকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচেও গোল—বিদায়ের গল্পে এর চেয়ে সুন্দর সংযোজন আর কী হতে পারে?
গোলের পরও থামেননি মেসি। দ্বিতীয় গোলের সুযোগ পেয়েছিলেন নিকো গঞ্জালেসের পাস থেকে। কাছ থেকে নেওয়া শটটি অবশ্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। আরেকটি শট বেনিনের গোলরক্ষকের গায়ে লেগে পোস্টে ফিরে আসে।
সময় তখন ফুরিয়ে আসছে। গ্যালারিতে সমর্থকেরা গান ধরেছেন। কেউ আর শুধু ম্যাচ দেখছেন না; তাঁরা শেষবারের মতো উপভোগ করছেন মেসির প্রতিটি স্পর্শ।
শেষ সুযোগটিও এসেছিল তাঁর পায়ের কাছেই। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা পায় ফ্রি-কিক। গোল থেকে দূরত্ব ২১ মিটার। গ্যালারির হাজারো মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তখন মেসির দিকে তাক করা। সবাই অপেক্ষা করছিলেন—শেষ মুহূর্তে কি আরেকটি গোল লেখা হবে?
রূপকথার সেই শেষ দৃশ্য অবশ্য আর আসেনি। মেসির ফ্রি-কিক বারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
তারপর শেষ বাঁশি।
শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২১ বছরের পথচলা। যে জার্সিতে তিনি পেয়েছেন ব্যর্থতার তীব্র যন্ত্রণা, শুনেছেন সমালোচনা, দেখেছেন অশ্রু; আবার সেই জার্সিতেই বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার ট্রফি হাতে তুলেছেন।
বিদায়ের রাতেও তিনি গোল করেছেন, সতীর্থদের গোল বানিয়ে দিয়েছেন, দর্শকদের কাঁদিয়েছেন—নিজেও কেঁদেছেন।
তাই মনুমেন্টালের সেই রাত শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়। এটি ছিল একটি যুগের বিদায়।
আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে মেসির শেষ ছবি হয়তো এমনই থাকবে—চোখে জল, মুখে হাসি, চারপাশে সতীর্থদের আলিঙ্গন আর গ্যালারি থেকে একসঙ্গে উঠে আসা অসংখ্য কণ্ঠের একটাই ডাক—মেসি, মেসি, মেসি।