রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই অপেক্ষায় বাংলাদেশ

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০
 ছবি:

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে কেন্দ্রটির চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময়ে প্রকল্প এলাকার মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে উচ্ছ্বাস ও উদ্বেগ—কারও কাছে রূপপুর নতুন কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রতীক, আবার কারও কাছে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদুল হাসান বলেন, কেন্দ্রটির প্রথম রিঅ্যাক্টর চলতি বছরের শেষ দিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটও এর পরবর্তী এক বছরের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে জানান তিনি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু দেশের বিদ্যুৎ খাতেই পরিবর্তন আনছে না; প্রকল্প ঘিরে বদলে গেছে এর আশপাশের এলাকার অর্থনীতিও। একসময় তুলনামূলক শান্ত ও গ্রামীণ জনপদ হিসেবে পরিচিত রূপপুরে এখন বড় অবকাঠামো, নতুন ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, আবাসন ও পরিবহনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। কয়েক হাজার স্থানীয় মানুষের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের কারণে স্থানীয় জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি সাংস্কৃতিক মাত্রাও। রূপপুরের বিভিন্ন দোকান ও রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি রুশ ভাষাও দেখা যায়। স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি কিছু রেস্তোরাঁয় রাশিয়ার জনপ্রিয় ‘বর্শ’ স্যুপসহ বিভিন্ন রুশ খাবারও পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি উদাহরণ ২৮ বছর বয়সী মো. ইমন খান। ঢাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ায় চাকরি ছেড়ে এলাকায় ফিরে ফল ও শাকসবজি বিক্রি শুরু করেছেন। ইমনের ভাষায়, রূপপুরে কাজ করতে আসা রুশ নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে তিনি সামান্য রুশ ভাষাও শিখেছেন।

রূপপুরে কর্মরত রুশ নাগরিকদের জীবনেও প্রকল্পটি আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। রুশ ইন্সটলেশন টেকনিশিয়ান আলেকজান্দার ভ্লাদিমিরোভিচ স্কভোর্তসোভ জানান, তুরস্ক ও বাংলাদেশে কাজের সুযোগ থাকলেও তিনি রূপপুরকে বেছে নেন। ২০২৪ সালে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আসার পর প্রকল্পের ব্যাপক নির্মাণকাজ তাকে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে। তার ভাষায়, রূপপুর তার জীবন ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে।

স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও প্রকল্পটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা। ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাফিজ মনে করেন, রূপপুরের কারণে তার এলাকা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হচ্ছে। প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করার স্বপ্ন রয়েছে তার।

তবে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের এই আশাবাদের পাশাপাশি রয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে হাঁটা দূরত্বে বসবাসকারী ৮০ বছর বয়সী সাবেক কাগজকল শ্রমিক মো. ইউনুস আলী বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল। সম্প্রতি কেন্দ্রের একটি যন্ত্র পরীক্ষার সময় বিকট শব্দে ঘুমন্ত শিশুরা জেগে ওঠার ঘটনাও তার উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নিজের চেয়ে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত তিনি।

রূপপুর কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, কেন্দ্রটির নকশা, নির্মাণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনাগুলো থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া, বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের মানুষের সুরক্ষা—সবগুলো বিষয়ই নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে।

রূপপুরের প্রতি মানুষের প্রত্যাশার আরেকটি বড় জায়গা বিদ্যুৎ সরবরাহ। কেন্দ্রটি দ্রুত উৎপাদনে গেলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সাধারণ মানুষের। স্থানীয় কৃষক বেলী বেগমের প্রত্যাশাও সে রকম। তার বাড়ির কাছেই বিশাল এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। তিনি চান, কেন্দ্রটি দ্রুত চালু হোক এবং এর সুফল দেশের মানুষ পায়। তার আশা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে সাধারণ মানুষও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের সুবিধা পাবেন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনার ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল ষাটের দশকেই। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স, সৌদি আরব, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তির পর প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়। ২০১৭ সালে এর নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

রূপপুর প্রকল্পে দুটি ইউনিটে মোট ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমসহ দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পের অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বড় অংশও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা কারণে সময় লেগেছে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সরঞ্জাম পরিবহনে জটিলতা প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নির্ধারিত সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে।

রূপপুরকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটির ব্যয়, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে তথ্য ও সিদ্ধান্ত সামনে আসবে, তার ভিত্তিতেই বিষয়টি মূল্যায়ন করা হবে।

সব মিলিয়ে রূপপুর এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা—চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণপর্ব শেষ হয়ে উৎপাদন শুরুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অপেক্ষাও তাই আরও স্পষ্ট হচ্ছে—বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হবে কতটা, আর নিরাপত্তার প্রশ্নে তৈরি হবে কতটা আস্থা, তার উত্তর মিলবে কেন্দ্রটি বাস্তবে চালু হওয়ার পরই।
 

১

যুক্তরাষ্ট্রে হামের রেকর্ড প্রাদুর্ভাব, নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা

২

দিল্লিতে ভবন ধসে নিহত ৩, আহত ৮

৩

আটলান্টিক মহাসাগরে মেডিকেল বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ৬

৪

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক

৫

নাটোর রেলস্টেশনে জার্মান পর্যটকের ব্যাগ চুরির অভিযোগ

৬

মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ, সেপ্টেম্বরে বাড়ল জীবনযাত্রার ব্যয়

৭

আতঙ্ক-উচ্ছ্বাস দুই নিয়েই অপেক্ষায় বাংলাদেশ

৮

মহাকাশ থেকে বাংলাদেশ দেখতে কেমন? ছবি তুলে দেখালেন বিজ্ঞানীরা

৯

ডেঙ্গুতে রংপুর বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ রোগী শনাক্ত, মৃত্যু ১

১০

গণভোট অবৈধ হলে বিএনপি সরকারও অবৈধ: মামুনুল হক

১১

পানির হিস্যায় ভারতকে এক চুলও ছাড় দেবো না: নাহিদ ইসলাম

১২

খাগড়াছড়িতে প্রায় ৩ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি

১৩

ভালুকায় নারী শ্রমিককে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২

১৪

রংপুরে কিশোরীকে চার দিন ধরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

১৫

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে পুলিশের চক্র

১

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

২

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

৩

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

৪

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

৫

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

৬

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

৭

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

৮

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

৯

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত