মহাকাশ থেকে বাংলাদেশকে দেখতে কেমন লাগে—সেই দৃশ্য এবার ধরা পড়েছে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) উপগ্রহচিত্রে। কোপারনিকাস সেন্টিনেল-২ মিশনের তোলা ছবিতে একই ফ্রেমে উঠে এসেছে ভারতের কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা, বাংলাদেশের অংশবিশেষ এবং সুন্দরবন। ছবিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সবুজ ভূখণ্ডের পাশাপাশি অসংখ্য নদী, জলাশয় ও কৃষিজমির চিহ্নও স্পষ্ট দেখা যায়।
ছবিটির কেন্দ্রের দিকে রয়েছে কলকাতা। ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরটি আশপাশের সবুজ এলাকার মধ্যে ধূসর একটি বিস্তৃত অঞ্চল হিসেবে দেখা যাচ্ছে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হুগলি নদীও ছবিতে স্পষ্ট। কলকাতার পূর্ব দিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে—শহুরে ধূসর অংশের পরিবর্তে সেখানে সবুজ ও নীল রঙের বিস্তৃতি বেশি।
উপগ্রহচিত্রে বাংলাদেশের সবুজ অংশ মূলত উদ্ভিদ ও কৃষিভূমির বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে। পাশাপাশি বিভিন্ন আকারের নীল রেখা ও জলীয় অংশ দেখা যায়, যা নদী, খাল, জলাশয় ও অন্যান্য জলাভূমির উপস্থিতি নির্দেশ করে। ছবিতে আয়তাকার আকৃতির কিছু জলভাগও চোখে পড়ে, যেগুলো কৃষিজমি ও মাছের চাষের পুকুর হিসেবে শনাক্ত করা যায়। কলকাতা ও বাংলাদেশের এই অঞ্চলের উপগ্রহচিত্রে কৃষি ও জলভিত্তিক ভূদৃশ্যের এমন বৈচিত্র্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি মহাকাশ থেকে এমনভাবে দৃশ্যমান হওয়ার পেছনে রয়েছে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রসহ বড় নদীগুলোর পলি বহন করে বঙ্গোপসাগরে এসে জমার ফলে গড়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ অঞ্চল। এই বদ্বীপজুড়ে নদী, শাখানদী, খাল, বিল, জলাভূমি ও কৃষিজমির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে সেই নদীনির্ভর ভূপ্রকৃতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছবিটির দক্ষিণাংশে বিশেষভাবে নজর কাড়ে সুন্দরবন। উপগ্রহচিত্রে এটি গাঢ় সবুজ অঞ্চলের মতো দেখা যায়। এর আশপাশের তুলনামূলক উজ্জ্বল অংশগুলোতে জনবসতি ও কৃষিজমির উপস্থিতি দেখা যায়। সুন্দরবনের ভেতরে অসংখ্য নদী, খাল ও জোয়ার-ভাটার চ্যানেল ছড়িয়ে রয়েছে, যা উপগ্রহচিত্রে একটি জটিল জলপথের নেটওয়ার্কের মতো দেখা যায়।

সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের একটি বনাঞ্চল নয়; বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিস্তৃত এই ম্যানগ্রোভ অঞ্চলটি বিশ্বের বৃহত্তম একক ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে পরিচিত। এর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। উপগ্রহচিত্রে সুন্দরবনের ঘন গাঢ় সবুজ অংশের সঙ্গে পাশের অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল কৃষি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা সহজেই আলাদা করা যায়।
সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলও। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা এই বনাঞ্চল একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইএসএর প্রকাশিত ছবির বর্ণনাতেও সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন ও বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তবে উপগ্রহচিত্র শুধু পৃথিবীর ওপরের দৃশ্য দেখানোর জন্য নয়। এর মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে কোনো এলাকার ভূপ্রকৃতি কীভাবে বদলাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা যায়। কৃষিজমির পরিবর্তন, বনভূমির বিস্তার বা সংকোচন, জলাশয়ের অবস্থার পরিবর্তন, নগরায়ণের বিস্তার এবং ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন শনাক্ত করতে সেন্টিনেল-২-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়।
সেন্টিনেল-২ মিশন মূলত পৃথিবীর ভূমি ও উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি। মিশনটিতে একাধিক উপগ্রহ রয়েছে এবং এগুলোতে ১৩টি স্পেকট্রাল ব্যান্ডের মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজার ব্যবহার করা হয়। দৃশ্যমান আলো ছাড়াও কাছাকাছি ইনফ্রারেড ও শর্টওয়েভ ইনফ্রারেড অংশে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এসব যন্ত্র। ফলে খালি চোখে দেখা সাধারণ ছবির চেয়ে ভূমি, উদ্ভিদ ও জলভাগের পার্থক্য আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব।
সেন্টিনেল-২-এর কিছু ব্যান্ডে ১০ মিটার পর্যন্ত স্থানিক রেজল্যুশন রয়েছে। অর্থাৎ উপগ্রহের সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে তুলনামূলক ছোট এলাকার ভূপ্রকৃতিও আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর একটি পর্যবেক্ষণ-সোয়াথ প্রায় ২৯০ কিলোমিটার প্রশস্ত। দুটি উপগ্রহ মিলিয়ে একই এলাকার ওপর প্রায় পাঁচ দিন পরপর আবার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
এই সক্ষমতার কারণে কোনো অঞ্চলের একবারের ছবি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কয়েক বছর বা কয়েক মাসের ব্যবধানে তোলা ছবির তুলনাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ইএসএ এর আগে ঢাকার ২০১৭ ও ২০২৬ সালের সেন্টিনেল-২ চিত্র পাশাপাশি দেখিয়ে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় নগরায়ণের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করেছে। ওই তুলনামূলক চিত্রে নগর সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষিজমি ও জলাভূমির ওপর এর প্রভাবও দৃশ্যমান হয়েছে।
মহাকাশ থেকে বাংলাদেশের দিকে তাকালে তাই শুধু সবুজ একটি ভূখণ্ড দেখা যায় না। দেখা যায় নদী ও শাখানদীর জাল, কৃষিজমির বিস্তার, জলাভূমি, জনবসতি, নগরায়ণ এবং দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের বিশাল সবুজ অঞ্চল। মাটির কাছ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা এসব ভূদৃশ্য মহাকাশ থেকে একই ছবিতে এসে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতির একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করে।
আর স্যাটেলাইটের এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে শুধু কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়, বাংলাদেশের কৃষি, বন, পানি ও নগর ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।