মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল বিনিয়োগ বদলে দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি ও প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের (পিএসজি) ভাগ্য। একসময় ইউরোপের অভিজাত ক্লাবগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে সংগ্রাম করা দল দুটি এখন মহাদেশীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তি। কাতারের বিনিয়োগে পিএসজি যেমন ফরাসি ফুটবলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, তেমনি আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগের হাত ধরে ম্যানচেস্টার সিটিও হয়ে উঠেছে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটি। এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দলের নতুন বাস্তবতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সামর্থ্য।
আজ বুধবার রাতে ইতিহাদ স্টেডিয়ামে সিটির প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি। ম্যাচটি দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে শাস্তির আশঙ্কা সামলানো সিটি, অন্যদিকে ইউরোপীয় শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে থাকা পিএসজি। তবে মাঠের লড়াইয়ে বাড়তি আকর্ষণ আর্লিং হালান্ড। গোলের পর গোল করে চলা নরওয়েজীয় স্ট্রাইকারের সামনে রয়েছে ব্যক্তিগত রেকর্ডের একাধিক মাইলফলক।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রিমিয়ার লিগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গত রোববার অ্যানফিল্ডে লিভারপুলকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে সিটি। সেই জয়ে প্রিমিয়ার লিগে টানা ছয় ম্যাচ জিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে তারা। অভিযোগের বিষয়ে সিটি আপিল করেছে; ফলে শাস্তির চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে এসব বিতর্কের প্রভাব পড়তে দেয়নি দলটি। পেপ গার্দিওলার বিদায়ের পর নতুন কোচ এনজো মারেস্কার অধীনে শুরু থেকেই জয়ের ধারায় রয়েছে সিটি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও পোর্তোকে ২-০ গোলে হারিয়ে অভিযান শুরু করেছে তারা।
অন্যদিকে পিএসজিও ইউরোপীয় মঞ্চে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে। লিগ পর্বের প্রথম ম্যাচে স্লোভান ব্রাতিস্লাভাকে ৬-১ গোলে হারিয়েছে লুইস এনরিকের দল। ঘরোয়া লিগে মৌসুমের শুরুতে কিছুটা হোঁচট খেলেও পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে ইতিহাদে নামবে ফরাসি ক্লাবটি। দুই দলের সাম্প্রতিক লড়াইয়ের স্মৃতিও তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে পিএসজির মাঠে ৪-২ গোলে হেরেছিল সিটি। এবার নিজেদের মাঠে সেই হিসাব মেলাতে চাইবে স্বাগতিকেরা।
রেকর্ডের সামনে হালান্ড
সিটির ম্যাচ শেষ হলে অনেক সমর্থকের প্রথম প্রশ্ন—হালান্ড গোল করেছেন তো? তাঁর গোল করার ধারাবাহিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দল মাঠে নামলেই সমর্থকেরা অপেক্ষায় থাকেন নরওয়েজীয় তারকার গোলের খবরের। ঘরোয়া লিগ থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ—প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানোই যেন তাঁর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ।
২৬ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলসংখ্যা ৫৯, যা এসেছে ৫৯ ম্যাচে। অর্থাৎ প্রতিটি ম্যাচে গড়ে একটি করে গোল করেছেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রতিযোগিতাটিতে ৪০ ম্যাচে তাঁর গোল ৩৬টি। ক্লাবটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সমান ৩৬ গোল রয়েছে সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা সার্জিও আগুয়েরোরও, যদিও সেই মাইলফলকে পৌঁছাতে আগুয়েরো খেলেছেন ৬৪ ম্যাচ। পিএসজির বিপক্ষে গোল করতে পারলে সিটির হয়ে ইউরোপের এই প্রতিযোগিতায় এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার সুযোগ পাবেন হালান্ড।
ইউরোপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকাতেও তাঁর অবস্থান উল্লেখযোগ্য। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ১৪০ গোল নিয়ে শীর্ষে, লিওনেল মেসির গোল ১২৯। এরপর রবার্ট লেভানডফস্কি ১০৯ ও করিম বেনজেমা ৯০ গোল নিয়ে রয়েছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও রাউল গঞ্জালেসের গোল ৭১টি করে। হালান্ডের গোল ৫৯, যা তাঁকে তালিকার সপ্তম স্থানে রেখেছে। পিএসজির বিপক্ষে গোলসংখ্যা বাড়াতে পারলে শীর্ষ গোলদাতাদের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর পথে এগোবেন তিনি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বেও হালান্ডের আধিপত্য চোখে পড়ার মতো। ২০১৯-২০ মৌসুমে অভিষেকের পর থেকে এই পর্যায়ে তাঁর গোল করার ধারাবাহিকতা তাঁকে প্রতিযোগিতার অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে। ইতিহাদে তাঁর রেকর্ডও সিটির জন্য বাড়তি আশার কারণ। ক্লাবটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে করা ৩৬ গোলের ২৩টিই এসেছে নিজেদের মাঠে।
শুধু ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা নয়, সিটির সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকাতেও দ্রুত ওপরে উঠছেন হালান্ড। ২০২২ সালে ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২০৬ ম্যাচে তাঁর গোল ১৭০টি। সামনে রয়েছেন এরিক ব্রুক, যাঁর গোল ১৭৭। আর ২৬০ গোল নিয়ে সিটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা আগুয়েরো। চলতি মৌসুমেও গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন হালান্ড। লিভারপুলের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচেও গোল করেছেন তিনি।
তবে পিএসজির বিপক্ষে আজকের লড়াই কেবল হালান্ডের ব্যক্তিগত মাইলফলকের নয়। ইউরোপের দুই শক্তিশালী ক্লাবের জন্য এটি নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণেরও বড় মঞ্চ। সিটির আক্রমণে হালান্ড যেমন বড় ভরসা, তেমনি পিএসজির তারকারাও যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। ইতিহাদের গ্যালারিতে তাই সমর্থকদের প্রত্যাশা—সিটির জয়, হালান্ডের গোল এবং ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় রাত।