আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আবেগঘন বিদায়ের পর ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির মন্তব্য
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর আবেগঘন মুহূর্তের পর আবারও আলোচনায় ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় কে—লিওনেল মেসি, নাকি পেলে? এই বিতর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী দলের তারকা রোমারিও। আর্জেন্টাইন মহাতারকার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানালেও সর্বকালের সেরা হিসেবে তিনি এগিয়ে রেখেছেন স্বদেশি কিংবদন্তি পেলেকে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম *ও দিয়া*-তে প্রকাশিত এক কলামে রোমারিও লিখেছেন, মেসি অসাধারণ ফুটবলার হলেও পেলের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে না। তাঁর মতে, দক্ষতা, গতি ও গোল করার নিখুঁত ক্ষমতার যে সমন্বয় পেলের খেলায় দেখা গেছে, তা ছিল অনন্য। মেসিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকার করেও রোমারিওর মূল্যায়ন, পাঁচ দশক আগেই পেলে এমন ফুটবল খেলেছেন, যা তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।
ফুটবলের সর্বকালের সেরা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। পেলের তিনটি বিশ্বকাপ জয়, অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের কিংবদন্তি মর্যাদা যেমন তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে, তেমনি মেসির বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকা সাফল্য, ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ার তাঁকে এই বিতর্কে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। তবে ভিন্ন সময়ের ফুটবলারদের তুলনা করতে গিয়ে খেলার ধরন, প্রতিযোগিতার কাঠামো, প্রশিক্ষণ, শারীরিক প্রস্তুতি ও পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হয়।
রোমারিওর মন্তব্যে মেসির প্রতি অসম্মান নয়, বরং পেলের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের মুগ্ধতাই সামনে এসেছে। মেসিকে তিনি সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন; কিন্তু পেলের খেলার বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রভাবকে এমন এক উচ্চতায় রেখেছেন, যেখানে তাঁর মতে অন্য কারও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
মেসির বিদায়ে ফিরে এল রোমারিওর স্মৃতি
মেসির আন্তর্জাতিক বিদায়ের দৃশ্য রোমারিওকে নিজের বিদায়বেলার স্মৃতিও মনে করিয়ে দিয়েছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচে মেসিকে ঘিরে সমর্থকদের আবেগ, গ্যালারিতে বিশাল ১০ নম্বর জার্সি এবং ‘গ্রাসিয়াস’ বার্তা—সব মিলিয়ে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে তৈরি হয়েছিল স্মরণীয় এক পরিবেশ।
৭ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নামেন মেসি। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দুটি গোলে সহায়তা করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার মুহূর্তে আবেগাপ্লুত মেসির বিদায়কে ঘিরে সমর্থকদের ভালোবাসা ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ।
রোমারিওর নিজের বিদায়ী ম্যাচটিও ছিল আবেগে ভরা। ২০০৫ সালে গুয়াতেমালার বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছিলেন তিনি। সেই গোল উদ্যাপনের সময় নিজের জার্সির নিচে পরা একটি বার্তা সামনে এনে সদ্যোজাত কন্যা আইভির কথা জানান। ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্ম নেওয়া আইভিকে ঘিরে তাঁর সেই বার্তা ছিল ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা ফুটবল মাঠের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে।
মেসির বিদায় ও নিজের সেই স্মৃতির মধ্যে মিল খুঁজে পেয়েছেন রোমারিও। দুই তারকার বিদায়ের মুহূর্ত আলাদা হলেও জাতীয় দলের জার্সির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক, সমর্থকদের ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত আবেগ—এসবই তাঁদের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে বিশেষ করে তুলেছে।
বিতর্কের শেষ নেই
পেলে ও মেসির তুলনায় একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। পেলে তিনটি বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন এবং বিংশ শতাব্দীর ফুটবলে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। অন্যদিকে মেসি আর্জেন্টিনাকে ২০২২ বিশ্বকাপ ও একাধিক কোপা আমেরিকা জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন।
কেউ পেলের ঐতিহাসিক প্রভাব ও বহুমুখী দক্ষতাকে এগিয়ে রাখেন, কেউ মেসির ধারাবাহিকতা, সৃজনশীলতা ও আধুনিক ফুটবলে অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেন। রোমারিওর বক্তব্য এই পুরোনো বিতর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁর অবস্থান ব্যক্তিগত মূল্যায়ন—ফুটবল ইতিহাসের সেরা কে, সেই প্রশ্নে সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক মানদণ্ড নেই।
মেসির বিদায় তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি নয়; ফুটবলের বিভিন্ন যুগের কিংবদন্তিদের তুলনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। আর সেই আলোচনায় রোমারিওর রায় স্পষ্ট—মেসি অসাধারণ, কিন্তু তাঁর চোখে পেলের উচ্চতা আলাদা।