জাতীয় ও আন্তর্জাতিক

চীনের নতুন জলপথে বদলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ-মানচিত্র

আজাদ প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৯
 ছবি:

পিংলু খাল, কিয়াউকপিউ ও ভারতের বিকল্প করিডর ঘিরে নতুন যোগাযোগ বলয়; বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সামনে বাড়ছে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ-মানচিত্রে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে নতুন জলপথ ও করিডর গড়ে তুলছে। একই সময়ে ভারতও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে। এই দুই প্রবাহের মাঝামাঝি অবস্থান করায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ী বন্দর আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন নেটওয়ার্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম নতুন সংযোজন দক্ষিণ চীনের ১৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পিংলু খাল। শিজিয়াং নদীকে বেইবু উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের স্থলবেষ্টিত অঞ্চলগুলোর সমুদ্রগামী যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যেই নির্মিত হয়েছে। গুয়াংসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, খালটি ব্যবহার করলে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার কমতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ এই জলপথে চলাচল করতে পারবে।

পিংলু খালের গুরুত্ব শুধু পরিবহন ব্যয় বা দূরত্ব কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের ইউনান ও গুইঝৌর মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের জন্য সমুদ্রপথে যাওয়ার নতুন বিকল্প তৈরি হচ্ছে। এতে নির্দিষ্ট একটি বন্দর বা করিডরের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ চীনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোকে সমুদ্রবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন একটি পথ যুক্ত হলো।

চীনের আঞ্চলিক যোগাযোগ কৌশলে মিয়ানমারও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনানের পাশের দেশটির রাখাইন উপকূলে কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য পথ। কিয়াউকপিউ থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনও চালু রয়েছে। একই সঙ্গে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর, কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ম্যান্ডালে-মুসে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে দুই দেশ কাজ করছে। ফলে চীনের জন্য একদিকে বেইবু উপসাগরমুখী পিংলু খাল, অন্যদিকে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরমুখী করিডর—দুটি ভিন্ন ধরনের সমুদ্রসংযোগের সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি করিডরের নিরাপত্তা ও স্থলভাগের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।

এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সরাসরি পিংলু খালের অংশ নয়। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে যে নতুন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, তার কাছাকাছি অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এর ফলে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের বন্দর ও স্থল যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়তে পারে।

চীন বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর বা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা আগেই সামনে এনেছে। তবে এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও নানা জটিলতা রয়েছে এবং বাংলাদেশ এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে প্রস্তাবিত করিডরকে বাস্তবায়িত প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ভবিষ্যতে এটি এগোলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দর অবকাঠামোর সম্প্রসারণও এই সম্ভাবনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে। চট্টগ্রাম ও মোংলার পাশাপাশি কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। এসব অবকাঠামো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু অন্য দেশের করিডরের ওপর নির্ভরশীল একটি ট্রানজিট ভূখণ্ড না থেকে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

অন্যদিকে ভারতও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে একাধিক প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। মিয়ানমার হয়ে কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মিয়ানমারের সংঘাত ভারতের এসব যোগাযোগ প্রকল্পের বাস্তবায়নেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

চীনের নতুন জলপথে বদলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ-মানচিত্র

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে। ২০২৩ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর বাস্তব ব্যবহারও বেড়েছে।

এভাবে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে একটি বহুমাত্রিক যোগাযোগ কাঠামো। চীন তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য সমুদ্রের দিকে বিকল্প পথ তৈরি করছে, ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নতুন সংযোগ খুঁজছে। আর এই দুই আঞ্চলিক প্রবাহের মাঝখানে বাংলাদেশের বন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে পুরো বিষয়টিকে কেবল চীন-ভারত ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখলে অর্থনৈতিক দিকটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপথের উন্নয়ন একাধিক দেশের বাজারকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একই অবকাঠামো বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যে ব্যবহারযোগ্য হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা থাকে। এতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের স্বচ্ছতা, ঋণের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হয়। মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, একটি করিডরের কার্যকারিতা শুধু সড়ক, রেল, বন্দর বা পাইপলাইন নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্থিতিশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে পিংলু খাল চীনের একটি নতুন জলপথ নির্মাণের চেয়ে বড় একটি আঞ্চলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে ঘিরে ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমেই বহু-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। চীন ও ভারত নিজেদের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন পথ তৈরি করছে; একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে তৈরি হচ্ছে বন্দর, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে নিজস্ব বন্দর, নৌপথ, রেল ও সড়ক অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি নীতি তৈরি করা। বঙ্গোপসাগরের এই নতুন সংযোগ-মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তাই শুধু ভৌগোলিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কার্ডে বাড়ছে লেনদেন, পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি ১০৮ শতাংশ

জাকির নায়েকের বাড়িতে আজহারী, বিদায়ের আগে পেলেন ‘কিসওয়াতুল কাবা’ আতর

শেখ হাসিনাকে ফেরাতে কী উদ্যোগ, জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি

প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার শিক্ষকের যোগদান-পদায়নে সুখবর

সৌদির অনুরোধের পর ইরানকে হুতিদের থামাতে বলেছে বেইজিং

সারাদেশে একযোগে ৯৯ জন বিচারক বদলি

‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর পাভেলের ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়া নিয়ে আলোচনা

দীঘিকে এড়িয়ে গেলেন তথ্যমন্ত্রী, জয় বললেন—পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার দিন শেষ

হকির আরেকটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ

১০

চরিত্রের ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন অনুভব করতে চান রুনা খান

১১

চীনের নতুন জলপথে বদলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ-মানচিত্র

১২

ঋতুপর্ণাদের ফিরিয়েও হাফডজন গোলে হার বাংলাদেশের

১৩

নরেন্দ্র মোদিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন তারেক রহমান

১৪

ওসির অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত কমিটি, জিজ্ঞাসাবাদ

১৫

২৫ কোটি বাজেটে ৩১০ কোটি আয়, ইতিহাস গড়ল ‘অসম প্রেমের’ সিনেমাটি

ট্রেনের ১৭ হাজার টিকিটের জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ বার চেষ্টা

দিল্লিতে ভারী বৃষ্টিতে বিমান চলাচল বিঘ্ন, ব্যাপক দুর্ভোগ

মিরাজ-সৌম্যকে দলে টানতে চায় রংপুর

আওয়ামী লীগ নেত্রী গ্রেফতার

গাজায় একদিনে নিহত আরও ৭৯ ফিলিস্তিনি

বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ

মাদককারবারিদের নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ওসির

২ বহিরাগতের নিয়ন্ত্রণে সরকারি অফিস!

নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যতীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতির সুযোগ নেই: আলী রীয়াজ

১০

বনানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২

১১

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে স্থগিত যেসব চাকরির পরীক্ষা

১২

নন-ক্যাডারে ৪১৩৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ

১৩

৬৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

১৪

নারায়ণগঞ্জের আলোর বাতিঘর ‘সুধীজন পাঠাগার’

১৫

মাদ্রাসায় গ্রামীণ ফোন করপোরেট নম্বর ব্যবহার বাধ্যতামূলক

সম্পর্কিত