ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়সীমা এবং জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রদত্ত ভোটের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত, চেয়ারম্যান প্রার্থীর দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদের বিবরণ হলফনামায় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম হলে ফল স্থগিত বা নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের ক্ষমতাসহ বেশ কিছু নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। সাধারণ সদস্য প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ টাকা। এর আগে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যয়সীমা ছিল সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা এবং সদস্য প্রার্থীর ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ চেয়ারম্যান প্রার্থীর ব্যয়সীমা দ্বিগুণ এবং সদস্য প্রার্থীর ব্যয়সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।
নতুন বিধানে জামানত বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ না পেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের হলফনামায় সম্পদের বিবরণ দেওয়ার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীকে দেশে ও বিদেশে থাকা তাঁর সম্পদের বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে। ফলে প্রার্থীর আর্থিক ও সম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য ভোটারদের সামনে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা (সংশোধনী) প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বুধবার সংশোধিত বিধিমালাটি প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বা তাঁর নির্বাচনি এজেন্টের বিরুদ্ধে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশন তা তদন্ত করতে পারবে। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের ক্ষেত্রেও কমিশনকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো কেন্দ্রে বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কারসাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের কারণে ভোটগ্রহণের ফলাফল চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে কমিশন ওই কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত করতে পারবে। পরে অনুসন্ধানে প্রয়োজন মনে হলে ওই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন।
নির্বাচনে দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে এত দিন লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের সুযোগ ছিল। সংশোধিত বিধিমালায় এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনে পুনঃভোটের বিধান করা হয়েছে। এখন দুই বা ততোধিক প্রার্থী সর্বোচ্চ সমান ভোট পেলে লটারির পরিবর্তে তাঁদের মধ্যে পুনরায় ভোট গ্রহণ করা হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশন রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেবে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী ও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন ভোটারদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। দৃষ্টি বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অন্য কোনো কারণে কোনো ভোটারের ভোট দিতে সহায়তার প্রয়োজন হলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তাঁকে কমপক্ষে ২১ বছর বয়সী একজন সহায়তাকারী সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন।
কোনো ভোটার নিজে ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রতীকে চিহ্ন দিতে না পারলে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তাকারী ওই কাজটি করতে পারবেন। তবে সহায়তাকারী হিসেবে কোনো প্রার্থী, প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে নেওয়া যাবে না। সহায়তাকারীকে ভোটারের পছন্দের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা দিতে হবে। এ ধরনের ভোটারদের একটি তালিকাও সংরক্ষণ করবেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা।
নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, কমিশন অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সংশোধিত বিধিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের হুমকি দেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো, আঘাত করা, বলপ্রয়োগ করে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া কিংবা তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
একইভাবে কোনো ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া অথবা কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল থেকে বিরত রাখা কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এসব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে সংশোধিত বিধিমালায়। ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রয়োজনীয়সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠন করতে পারবে নির্বাচন কমিশন। এসব কমিটি নির্বাচনের সময় আচরণবিধি ও নির্বাচনি অপরাধের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করবে।
নির্বাচনে প্রার্থী, নির্বাচনি এজেন্ট বা পোলিং এজেন্টের অনুপস্থিতি নিয়েও বিধানে স্পষ্টতা আনা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে তাঁদের কেউ উপস্থিত না থাকলেও তাঁদের অনুপস্থিতির কারণে আইনানুগভাবে সম্পন্ন কোনো কার্যক্রম অবৈধ হবে না। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা বা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার কারণ লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।
এবারের ইউপি নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের জন্য নির্ধারিত প্রতীকের তালিকাও রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে ২০টি, সাধারণ সদস্য পদে ১২টি এবং সংরক্ষিত সদস্য পদে ১০টি প্রতীক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে ইউপি নির্বাচনের ব্যয়, জামানত, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, সমভোট এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াসহ বেশ কিছু বিষয়ে নতুন কাঠামো তৈরি হলো। বিশেষ করে প্রার্থীর ব্যয়সীমা ও সম্পদের তথ্য প্রকাশ এবং অনিয়মপূর্ণ কেন্দ্রের ফল স্থগিত বা নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এসব বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপরই সংশোধনের সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে। কারণ মাঠপর্যায়ে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম এবং প্রার্থীদের ব্যয়সীমা অতিক্রমের মতো বিষয়গুলো নজরদারি ও প্রমাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ জন্য তফসিল ঘোষণার পর মনিটরিং কমিটির কার্যক্রম এবং রিটার্নিং ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।