ঢাকা মেডিকেলে ফিল্ড হাসপাতাল চালুর চিন্তা, বার্ন ইউনিটের রোগী সরানোর উদ্যোগ
ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় রোগীর চাপ সামাল দিতে দেশের সব হাসপাতালকে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) চত্বরে স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালটি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। রোগীর চাপ কমাতে ঢামেকের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গত রোববার সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানোসহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, সভায় ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢামেক থেকে কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ঢামেক চত্বরে স্থাপিত ফিল্ড হাসপাতালটি চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আরও শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসার চাপ কমাতে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিবর্তে কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদেরও শয্যা বাড়াতে বলা হয়েছে।
ডা. নুরুল ইসলাম বলেন, সংকটের সময় সরকারি হাসপাতাল সাধারণত রোগী ফিরিয়ে দেয় না। কিন্তু রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের শয্যা সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সেই চাপ কমাতেই ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতেও প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫৬ জন। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৮১ জনের। এর মধ্যে পুরুষ ১৩২ জন এবং নারী ১৪৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
এর আগে ৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া ২৪ ঘণ্টার হিসাবে নতুন করে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের মধ্যে ওই ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। অক্টোবরের প্রথম ছয় দিনেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের।
মাসভিত্তিক হিসাবেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ এবং সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই আগের মাসের তুলনায় রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিভাগে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বরিশালে ২৪, চট্টগ্রামে ২৫, খুলনায় ৫৫, ময়মনসিংহে ২৩, রাজশাহীতে ১৯, রংপুরে ৬ এবং সিলেটে ২ জন মারা গেছেন।
ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে ইতোমধ্যে শয্যা বাড়ানো হয়েছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি ফ্লোরকে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তর করে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর তথ্যও জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
ঢামেকেও রোগীর চাপ বাড়ছে। হাসপাতালটির ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ডের পাশাপাশি অন্যান্য ওয়ার্ডেও রোগী ছড়িয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর এবং ফিল্ড হাসপাতাল চালুর বিষয়টি সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কিট, ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। ফলে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপই শনাক্ত হয়েছে। ফলে আগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে—এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এখন শয্যা বাড়ানো, বিকল্প হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা এবং ঢামেকের ফিল্ড হাসপাতাল চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।